এসরোস্কোপ মহাকাশ দেখার জানালা

আকাশ দেখছেন এসরো সদস্য আফরিন জাহান জেবু। ছবি: আসাদুল্লাহ আল গালিব
চুয়েটের মহাকাশবিষয়ক সংগঠন ‘এসরো’ তৈরি করেছে একটি ডবসোনিয়ান টেলিস্কোপ। বিস্তারিত ফাইয়াজ কৌশিকের বয়ানে
রাতের আকাশে চাঁদের দিকে তাকালে অনেকের মনেই মায়াময় অনুভূতি দোলা দেয়। খালি চোখে চাঁদের গায়ে কিছু দাগ নজরে পড়ে আমাদের। কিন্তু টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলে দাগগুলো পরিণত হয় গভীর খাদে। টেলিস্কোপের মাধ্যমে আকাশের দিকে তাকিয়ে দূর গ্রহ-নক্ষত্রের দৃশ্য দেখার পর নিজের ভেতর জন্মানো কৌতূহল থেকেই অনেকে মহাকাশ নিয়ে আরও জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)-এর কয়েকজন শিক্ষার্থী এমনই আগ্রহ থেকে একসময় ঠিক করলেন, বাইরে থেকে কিনবেন না, বরং নিজেরাই বানাবেন টেলিস্কোপ। তারা ক্যাম্পাসের মহাকাশবিষয়ক সংগঠন ‘এন্ড্রোমিডা স্পেস অ্যান্ড রোবোটিক রিসার্চ অর্গানাইজেশন (এসরো)’-এর সদস্য। শেষ পর্যন্ত চার মাসের হাতে-কলমে পরিশ্রমে তৈরি করেছেন ‘এসরোস্কোপ’। এটি একটি ডবসোনিয়ান টেলিস্কোপ। তার মানে সহজ ও কম খরচে তৈরি রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপ, যা ১৯৫৫ সালে আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন ডবসন জনপ্রিয় করে তোলেন।
মাটিতে বা সাধারণ কোনো কাঠামোর ওপর বসানো থাকে এই টেলিস্কোপ। এখানে কম খরচে বড় আকৃতির লেন্স বা আয়না ব্যবহার করা হয়। দূরের তারা, গ্যালাক্সি ও নীহারিকা পরিষ্কার দেখার জন্য এটি জনপ্রিয়। ব্যবহার করাও খুব সহজ।
স্বপ্নের সূত্রপাত
এসরোস্কোপ তৈরির গল্প শুরু বছর কয়েক আগে। ২০১৯ সালে চুয়েটের শহীদ মোহাম্মদ শাহ হলে বসে একটি ডবসোনিয়ান টেলিস্কোপ তৈরি করেছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ফাহিম ফয়সাল শুভ। এই কাজের মধ্যেই তাকে একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন এসরোর সভাপতি মৃন্ময় মোদক। তিনি বলেছিলেন, তাদের সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে টেলিস্কোপ তৈরির কর্মশালা আয়োজন করা হবে। এরপর ওই সদস্যরাই শুভর সঙ্গে মিলে টেলিস্কোপটি বানাবেন। এর ফলে মহাকাশ নিয়ে কাজ করা সংগঠনটির নিজস্ব একটি টেলিস্কোপ থাকবে। কিন্তু নানা কারণে সেই উদ্যোগ এগোয়নি। সময় গড়িয়েছে, শুভরও স্নাতক শেষ হয়েছে। তবে এসরোর টেলিস্কোপ তৈরির ইচ্ছা হারিয়ে যায়নি। পরে নতুন সভাপতি আরেফিন লাবিব আবার সেই উদ্যোগ সামনে নিয়ে আসেন। টেলিস্কোপ তৈরির কর্মশালা পরিচালনার জন্য শুভকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কর্মশালাটি করানোর পর নতুন করে শুরু হয় এসরোস্কোপ তৈরির যাত্রা।
হাতে-কলমে চার মাস
টানা চারটি মাস একেকটি অংশ তৈরি, সংযোজন ও পরীক্ষা করে এগিয়েছে কাজ। এই টেলিস্কোপ তৈরির নেপথ্যের কারিগর শুভ পাস করে গেছেন বলে চুয়েটের বাইরে থাকেন। তাই অনলাইনেই এসরো সদস্যদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ফয়সাল তাঈসীর ও রায়হানুল নাঈম এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের অম্লান সরকার, অনুপম দাস কাব্য, আসফাত কবির সিফাত, জান্নাতুল মাওয়া, রেজওয়ানুল আবেদীন, পার্থ সারথী গোস্বামী ও সঞ্জয় দাস এই প্রকল্পে কাজ করেছেন। এসরোস্কোপ নামটি তাদেরই রাখা।
২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ফয়সাল তাঈসীর ও রায়হানুল নাঈম এবং ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের অম্লান সরকার অনুপম দাস কাব্য, আসফাত কবির সিফাত, জান্নাতুল মাওয়া, রেজওয়ানুল আবেদীন, পার্থ সারথী গোস্বামী ও সঞ্জয় দাস এই প্রকল্পে কাজ করেছেন
শুধু চাঁদ নয়, নজর আরও দূরে
এই টেলিস্কোপে ব্যবহার করা হয়েছে স্ফেরিক্যাল কনকেভ মিরর। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম দেশে সহজলভ্য না হওয়ায় চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে। তবে নিজেদের মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে বেশ কিছু ত্রিমাত্রিক নকশা করেছেন চুয়েট শিক্ষার্থীরাই। মিরর সেল, সেকেন্ডারি মিরর হোল্ডার, স্পাইডার, মুভিং ও লকিং মেকানিজমের নকশা তাদেরই তৈরি। খালি চোখে দেখা যায় না— মহাকাশের এমন অনেক ক্ষীণ বস্তুও এই টেলিস্কোপে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। ফলে উপযুক্ত পরিস্থিতিতে আকাশে সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহের পাশাপাশি আরও দূরের মহাজাগতিক বস্তুও পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে। চাঁদের গায়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ক্রেটার, সৌরকলঙ্ক, চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ— এসব তো দেখা যায়ই। পাশাপাশি শনির বলয় কিংবা বৃহস্পতির উপগ্রহ এমনকি সৌরজগতের বাইরে থাকা দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তুগুলোও এই টেলিস্কোপে ধরা পড়ে। শহরের আলো থেকে দূরে, পরিষ্কার ও অন্ধকার আকাশের নিচে এসরোস্কোপ দিয়ে গ্যালাক্সি, নেবুলা বা নীহারিকাসহ বিভিন্ন ম্লান মহাজাগতিক বস্তু দেখার সুযোগ রয়েছে। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সিও দেখা সম্ভব।
টেলিস্কোপে বদলে গেল চাঁদ
তৈরির পর এসরোস্কোপ দিয়ে এরই মধ্যে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ করেছেন এসরোর সদস্যরা। এর একটি হলো পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। খালি চোখের পরিচিত চাঁদই টেলিস্কোপের চোখে বদলে গেছে। গর্ত, পাহাড় আর ছায়ার খেলা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আরও দূরে তাকানোর আগ্রহ নিয়ে সংগঠনটির সদস্যরা এই টেলিস্কোপে নিয়মিত আকাশ পর্যবেক্ষণ করছেন।
স্বপ্নের বাস্তব রূপ
ফাহিম ফয়সাল শুভ বললেন, ‘এসরোস্কোপ কয়েক বছর আগে শুরু হওয়া একটি স্বপ্নের বাস্তব রূপ। আশা করি, এর হাত ধরে চুয়েটে মহাকাশচর্চা আরও এগিয়ে যাবে এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের আকাশের রহস্য জানার আগ্রহ আরও বাড়বে।’ এসরোর বর্তমান সভাপতি সজীব কর বললেন, ‘চুয়েটে ডবসোনিয়ান টেলিস্কোপ তৈরি আমাদের তরুণ মহাকাশপ্রেমীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। নিজেদের হাতে এমন একটি যন্ত্র তৈরি আমাদের গবেষণার প্রতি আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও বললেন, ‘আগামীতে আমাদের একটি রেডিও টেলিস্কোপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। যার মাধ্যমে মহাজাগতিক রেডিও তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুর ওপর গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি রকেট্রি, রোবোটিকস ও স্পেস-টেকনোলজির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসরোর কার্যক্রম আরও বাড়বে।’






