কম সিজিপিএ নিয়েও গবেষণার সুযোগ

এস এম নাজমুল হাসান সিয়াম
একসময় নিজের সিজিপিএ অন্যদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে চাইতেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভা দিতে গিয়েও শুনতে হয়েছে সমালোচনা, কখনো অপমানজনক মন্তব্যও। বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের কথা বললে কেউ কেউ তার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ সেই ডা. এস এম নাজমুল হাসান সিয়াম গবেষণার মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় সম্পূর্ণ অর্থায়নে মাস্টার্স করার সুযোগ পেয়েছেন। জিওনবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক জুন এইচ পার্কের তত্ত্বাবধানে দুই বছর মেয়াদি গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স করবেন। তার গবেষণার বিষয় ‘ক্যানসার বায়োলজি’। এ প্রোগ্রামে তার টিউশন ফি ও জীবনযাপনের খরচ বহন করা হবে।
শিক্ষাজীবনের শুরুতে সিয়ামের লক্ষ্য ছিল চিকিৎসক হওয়া। তার মায়েরও ইচ্ছা ছিল, ছেলে চিকিৎসক হবে। নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসিতে এ প্লাস পাওয়ার পর মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে বাবার পরামর্শে বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদে ভর্তি হন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শুরুতে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও ধীরে ধীরে গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তার। তবে প্রচলিত পড়াশোনার সঙ্গে এই আগ্রহের সমন্বয় সহজ ছিল না। মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারতেন না সিয়াম। অন্যদিকে, গবেষণাগারের কাজ তাকে বেশি টানত। দিনের পর দিন, এমনকি রাত জেগেও গবেষণায় সময় দিতেন। পরীক্ষার আগের দিনও গবেষণাগারে কাজ করেছেন। এর প্রভাব পড়েছে ফলাফলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে তার সিজিপিএ দাঁড়ায় ২.৭৯।
কম সিজিপিএ নিয়ে সমালোচনা শুনলেও গবেষণাকে নিজের দক্ষতা গড়ে তোলার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন তিনি। তার গবেষণার পথচলা শুরু হয় সিনিয়র শিক্ষার্থী মুকিতের অনুপ্রেরণায়। পরে প্যারাসাইটোলজি বিভাগের সিনিয়র শারমিন আক্তার ঝুমুরের সহযোগিতায় গবেষণার জগতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে এসে অধ্যাপক ড. মো. গোলজার হোসেনের তত্ত্বাবধানে মৌলিক বিষয়গুলো শেখেন। গবেষণার কাজ পরিচালনা থেকে শুরু করে গবেষণাপত্র তৈরির ক্ষেত্রেও তার সহযোগিতা পেয়েছেন সিয়াম।
শুরু থেকেই অণুজীববিজ্ঞান, বিশেষ করে ভাইরাসবিজ্ঞান ও সংক্রামক রোগের প্রতি আগ্রহী ছিলেন সিয়াম। আমের বীজের শাঁস নিয়ে গবেষণা এবং বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো চিকেন ইনফেকশাস অ্যানিমিয়া ভাইরাসের জিনোটাইপ শনাক্তকরণ তার উল্লেখযোগ্য কাজ। দুটি গবেষণাতেই শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন তিনি। গবেষণাগুলো দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এসব কাজে অধ্যাপক গোলজার হোসেনের অবদানকে নিজের গবেষণাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন সিয়াম। এ ছাড়া হেপাটাইটিস-বি, গবাদি পশুর ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া, ফাউল পক্স, অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, বিড়ালের প্যানলিউকোপেনিয়া ও নিউক্যাসল রোগ নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। গবেষণার পাশাপাশি নমুনা সংগ্রহ, ডিএনএ ও আরএনএ পৃথক্করণ, পিসিআর পরীক্ষা এবং তথ্য বিশ্লেষণের মতো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করেছেন। কখনো নমুনা সংগ্রহের জন্য টানা দুই থেকে তিন দিন বাইরে থাকতে হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে রাত ২টা পর্যন্ত গবেষণাগারে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
গবেষণার পরিধি বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে অক্সফোর্ড বাংলাদেশ সেপসিস রিসার্চের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পে রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান সিয়াম। সেখানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি গবেষণায় অন্তঃসত্ত্বা নারীদের মূত্রনালির সংক্রমণ নিয়ে কাজ করেন। এখন সংগৃহীত নমুনাগুলোর জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ চলছে। বিশ্লেষণের জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে অক্সফোর্ডে। এটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা হওয়ায় এখনো ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের এই সংক্রমণ নিয়ে গবেষণাটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
গবেষণাপত্র প্রকাশের পাশাপাশি সিয়াম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তুলে ধরার সুযোগও পেয়েছেন। সেল ডেথ ও রিপ্রোডাক্টিভ এক্সোসোমেস বিষয়ক দুটি বইয়ের অধ্যায়ে অবদান রেখেছেন তিনি। অধ্যায় দুটি প্রকাশনার জন্য ইনটেকওপেনের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্যের রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত এসব বইয়ের অধ্যায়ে কাজ করাকে নিজের গবেষণাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা মনে করেন তিনি।
সিয়াম প্রতিটি গবেষণাকে নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের ধাপ হিসেবে দেখেন। তিনি বললেন, ‘এই সিজিপিএ নিয়েও দেশের বাইরে যেতে পারব। সেটি অনেক সময় অসম্ভব কল্পনা মনে হতো। আমি একে সম্ভব করেছি এবং আমার কাজের মূল্যায়ন পেয়েছি।’



