মনের খেয়াল
বিশ্রামে বিপত্তি

মডেল: প্রিয়াঙ্কা, ছবি: মঞ্জু আলম
ছুটির দিনে বিশ্রাম নিতে গেলেই মাথায় ঘুরে অফিসের অসমাপ্ত কাজ। মনে হয় সময়টা নষ্ট না করে আরও কিছু করা উচিত ছিল। এমন অপরাধবোধের নাম রেস্ট গিল্ট। সামলানোর উপায় জানাচ্ছেন নাহিদ ইসলাম
দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর একটি কর্মসপ্তাহের পর কারও ভাগ্যে জোটে একদিন, কারওবা দুদিনের ছুটি। সময়টা কেউ পরিবারকে দিতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কিংবা শুধু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে কাটাতে চান। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন। শরীর বিশ্রাম চাইলেও মন যেন থামতে নারাজ। বারবার মনে হতে থাকে, ‘রিপোর্টটা এখনো লেখা হয়নি’, ‘মেইলের উত্তর দেওয়া বাকি’, ‘সময়টা কাজে লাগিয়ে নতুন কোনো দক্ষতা শেখা যেত’। ফলে বিশ্রাম নেওয়ার বদলে জন্ম নেয় এক ধরনের অপরাধবোধ। মনে হয়, কিছু না করে বসে থাকা মানেই সময় নষ্ট করা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এ অনুভূতিকে বলে রেস্ট গিল্ট; যা বর্তমানে অনেক পেশাজীবীর মানসিক সুস্থতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
কর্মসংস্কৃতি এখন এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে সবসময় ব্যস্ত ও কর্মমুখর থাকাকেই সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এ ধারণা ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তার অংশ হয়ে গেছে। ফলে নিজের জন্য সময় বের করাও অনেকের মনেই অপরাধবোধের জন্ম দেয়। যেন কাজ না করলে নিজের মূল্যও কমে যায়। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত শারমিন বললেন, “অনেক সময় আমরা শুধু পেশাগত সাফল্য আর কর্মদক্ষতা দিয়েই নিজেকে মূল্যায়ন করি। ফলে যখন কেউ কাজ কম করেন বা বিশ্রামে থাকেন, তখন নিজেকে নিজের কাছেই কম মূল্যবান মনে হয়। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাফল্য দেখে অনেকেই নিজের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেন। তখন বিশ্রাম নিলেও মনে হয়, ‘আমি পিছিয়ে পড়ছি।’ এর পেছনে প্রডাক্টিভিটি কালচারের প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখে।”
দিনের পর দিন এমন অবস্থায় থাকলে শরীর বিশ্রাম পেলেও মন তা পায় না। ফলে স্নায়ুতন্ত্র কখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না
লক্ষণ দেখে চেনা
রেস্ট গিল্টের মূল লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে অবসর সময়েও বারবার মনে হওয়া, এখন কাজ করা উচিত। ছুটির দিনেও অফিসের ইমেইল বা মেসেজ বারবার দেখা। বিশ্রাম নেওয়ার সময় অপরাধবোধে ভোগা। পরিবার বা নিজের পছন্দের কাজে মনোযোগ দিতে না পারা, কারণ মাথা জুড়ে থাকে কাজের চিন্তা।
দিনের পর দিন এমন অবস্থায় থাকলে শরীর বিশ্রাম পেলেও মন তা পায় না। ফলে স্নায়ুতন্ত্র কখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক অবসাদ, বার্নআউট, মনোযোগের ঘাটতি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। সৃজনশীলতাও ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
প্রযুক্তির অগ্রগতি এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অফিস থেকে বেরিয়ে এলেও কাজ যেন পিছু ছাড়ে না। ইমেইল, মেসেজ, ভিডিও কল কিংবা জরুরি ফাইল— সবসময়ই হাতের নাগালে থাকে। ফলে কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। শরীর বাড়িতে থাকলেও মন পড়ে থাকে অফিসে।
অধ্যাপক নুসরাত শারমিনের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম ধাপ হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। বিশ্রাম কোনো অলসতা নয়; এটি সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং ভালোভাবে কাজ করার অপরিহার্য শর্ত। একটি যন্ত্র যেমন দীর্ঘক্ষণ চলার পর বিশ্রাম চায়, তেমনি মানুষের মস্তিষ্কেরও পুনরুদ্ধারের সময় প্রয়োজন।
তাই ছুটির দিনে কাজ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকার চেষ্টা করা ভালো। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে অফিসের ইমেইল বা মেসেজ না দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। পরিবার, বন্ধু কিংবা নিজের প্রিয় কোনো কাজে সময় দিন। মনে রাখবেন, বিশ্রাম কখনোই কাজের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং ভালোভাবে কাজ সম্পন্নের পূর্বশর্ত। সত্যিকারের বিশ্রামই আপনাকে আরও মনোযোগী, সৃজনশীল এবং কর্মক্ষম করে তুলবে।






