নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ

মডেল: নিশা চৌধুরী, পোশাক: আর্টিমিস, গয়না: হ্যান্ড টাচ, সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ, ছবি: মঞ্জু আলম
সুস্থ জীবনযাপনের জন্য নিজেকে সময় দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই চর্চা ‘মি টাইম’ নামে পরিচিত। এর গুরুত্বের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন সুবর্ণা মেহজাবীন
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন অন্য কারও জন্য বরাদ্দ! অফিস, পরিবার, বন্ধু, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— সবকিছুর মাঝখানে নিজের জন্য আলাদা করে সময় রাখা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এমনকি সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখতেও প্রয়োজন ‘মি টাইম’। এটি বিলাসিতা নয়; বরং সুস্থ জীবনযাপনের অপরিহার্য চাহিদা।
ব্যস্ততার ভিড়ে ‘আমি’
দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে অনেকেরই মনে হয়, সারা দিন অনেক কাজ করেও যেন নিজের জন্য কিছুই করা হয়নি। অফিসের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ফোনে আসে নতুন ইমেইল, মেসেজ বা নোটিফিকেশন। পরিবারের দায়িত্ব শেষ হলে অপেক্ষা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম স্ক্রল। দিনের হিসাব মিলে যায়, কিন্তু নিজের সঙ্গে কাটানো সময়ের খাতা প্রায়ই ফাঁকা পড়ে থাকে। আধুনিক জীবনের এই অদৃশ্য ক্লান্তি থেকেই বিশ্ব জুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে ‘মি টাইম’। সহজ কথায়, নিজের জন্য আলাদা করে রাখা এমন কিছু সময়, যেখানে কোনো দায়িত্বের চাপ কিংবা নিজেকে প্রমাণের তাড়া নেই; আছে শুধু নিজের মন, শরীর আর অনুভূতির প্রতি যত্ন।
অনেকের ধারণা, মি টাইম মানেই দীর্ঘ ছুটি, বিলাসবহুল ভ্রমণ কিংবা স্পা। বাস্তবে বিষয়টি এত জটিল নয়। ভোরের নরম আলোয় এক কাপ চায়ে চুমুক, প্রিয় বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা ওল্টানো, ছাদে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা, গান শোনা, ডায়েরি লেখা কিংবা নিঃশব্দে বসে থাকা— এসব ছোট ছোট মুহূর্তও হতে পারে মি টাইম। বিষয়টি সময়ের দৈর্ঘ্যের নয়; বরং সেই সময়টুকু কতটা নিজের জন্য বরাদ্দ, সেটিই আসল।
ভোরের নরম আলোয় এক কাপ চায়ে চুমুক, প্রিয় বইয়ের কয়েকটি পৃষ্ঠা ওল্টানো, ছাদে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা, গান শোনা, ডায়েরি লেখা কিংবা নিঃশব্দে বসে থাকা— এসব ছোট ছোট মুহূর্তও হতে পারে মি টাইম
কেন জরুরি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, উদ্বেগ, অবসাদ এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ এখন বিশ্ব জুড়ে অন্যতম স্বাস্থ্যঝুঁকি। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখাও অনেকটা মুছে দিয়েছে। ফলে কর্মঘণ্টা শেষ হলেও মানসিকভাবে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে শরীরের পাশাপাশি মনের ওপরও ধকল বাড়ে।
স্কয়ার হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. শারমিন হক জানান, মানুষের মস্তিষ্ক নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য তৈরি হয়নি। শরীরের মতো মনেরও বিশ্রাম প্রয়োজন। নিয়মিত নিজের জন্য কিছু সময় রাখলে মানসিক চাপ কমে, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটে। দীর্ঘদিন নিজের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করলে ধীরে ধীরে বার্নআউট তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিদিন অল্প সময় হলেও এমন কিছু করা উচিত, যা নিছক নিজের ভালো লাগার জন্য।
আমাদের সমাজে নিজের জন্য সময় রাখাকে এখনো অনেক সময় বিলাসিতা বা দায়িত্বহীনতা হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে পরিবারের যত্ন আর পুরুষদের ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্বই যেন প্রধান পরিচয়। এই সামাজিক বাস্তবতায় নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া অনেকের কাছেই অপরাধবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ নিজের যত্ন নেওয়া দায়িত্ব থেকে পলায়ন নয়; বরং দায়িত্ব পালনের শক্তি সঞ্চয় করা।
ডিজিটাল বিরতিতে সমাধান
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিনির্ভর জীবন। অনেকেই মনে করেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোই বিশ্রাম। কিন্তু বাস্তবে অবিরাম স্ক্রল মস্তিষ্ককে আরও ব্যস্ত রাখে। প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য, ছবি ও প্রতিক্রিয়া মনকে বিশ্রাম নিতে দেয় না। তাই বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন ও নোটিফিকেশন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। এই ছোট্ট ডিজিটাল বিরতিই মনোযোগ বাড়ানো, ঘুমের মান উন্নত করা এবং মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে।
ফ্যাশনে স্বাচ্ছন্দ্যের ভাষা
মি টাইমের প্রভাব ফ্যাশনেও স্পষ্ট। একসময় পোশাকের মূল বিবেচনা ছিল ট্রেন্ড ও বাহ্যিক সৌন্দর্য। এখন গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাচ্ছন্দ্য। কটন, খাদি, লিনেন কিংবা মসলিনের মতো আরামদায়ক কাপড়, ঢিলেঢালা নকশা এবং নিরপেক্ষ রঙের পোশাক ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে। কারণ, আরামদায়ক পোশাক শুধু শরীরকে স্বস্তি দেয় না, মানসিক চাপও কমায়।
অনুষঙ্গেও এসেছে পরিবর্তন। ভারী অলংকারের বদলে হালকা গয়না, আরামদায়ক জুতা, ব্যবহারিক ব্যাগ কিংবা প্রিয় একটি সুগন্ধি— এসবই নিজের খেয়াল রাখার অংশ। ফ্যাশন ডিজাইনার বিপ্লব সাহা বললেন, ‘ফ্যাশনে এখন আরামকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দিয়ে পোশাক নির্বাচন করাও আত্মযত্নের অংশ। কারণ, পোশাক শুধু অন্যকে দেখানোর জন্য নয়; নিজের ভালো লাগার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।’
রূপচর্চা যখন আত্মযত্ন
রূপচর্চার ধারণাতেও এসেছে পরিবর্তন। সৌন্দর্য এখন আর নিখুঁত দেখানোর প্রতিযোগিতা নয়; বরং নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়ার একটি অভ্যাস। দিনের শেষে ত্বক পরিষ্কার, ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, চুলের যত্ন বা কিছুক্ষণ উষ্ণ পানিতে গোসল— এসবই হতে পারে মানসিক প্রশান্তির অংশ।
আন্তর্জাতিক বিউটি ট্রেন্ডে ‘স্কিনিমালিজম’, অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় প্রসাধনীর বদলে স্বাস্থ্যকর ত্বকযত্ন জনপ্রিয়তা এখন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া কৃত্রিম সৌন্দর্যের চাপ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে গ্রহণ করাও মি টাইমের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ, আত্মযত্নের উদ্দেশ্য অন্যকে মুগ্ধ করা নয়, নিজের সঙ্গে স্বস্তির সম্পর্ক গড়ে তোলা। বিউটি এক্সপার্ট ফারনাজ আলম জানান, রূপচর্চা তখনই সেলফ-কেয়ার হয়ে ওঠে, যখন সেটি অন্যকে খুশি করার জন্য নয়; নিজের ভালো লাগার জন্য করা হয়। ত্বকের যত্ন নেওয়া মানে নিজেকে সময় দেওয়া, নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়া।
নিজের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া অনেকের কাছেই অপরাধবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ নিজের যত্ন নেওয়া দায়িত্ব থেকে পলায়ন নয়; বরং দায়িত্ব পালনের শক্তি সঞ্চয় করা
খাদ্যাভ্যাসে নিজের খেয়াল
ব্যস্ততার কারণে অনেকেই সময়মতো খেতে পারেন না। আবার অনেকে কাজ করতে করতেই খাবার শেষ করেন। পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ নিশাত শারমিন নিশি মনে করেন, কী খাচ্ছি, তার পাশাপাশি কীভাবে খাচ্ছি, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনভাবে ধীরে ধীরে খাবার খেলে হজম ভালো হয়, অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং মন শান্ত থাকে।
পুরুষদের মি টাইম
মি টাইম নিয়ে আলোচনা হলে বেশির ভাগ সময় নারীদের কথাই উঠে আসে। অথচ পুরুষদের মানসিক চাপও কম নয়। পরিবার, পেশা ও অর্থনৈতিক দায়িত্বের ভার বহন করতে গিয়ে অনেকেই নিজের অনুভূতিকে চাপা রাখেন। সমাজ এখনো পুরুষদের শেখায়, ক্লান্তি বা দুর্বলতা প্রকাশ না করাই শক্তির পরিচয়। এই সংস্কৃতি তাদের মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষেরও নিজের জন্য সময় প্রয়োজন। নিয়মিত শরীরচর্চা, খেলাধুলা, বই পড়া, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা কিংবা একা কিছুক্ষণ হাঁটা— এসব হতে পারে কার্যকর মি টাইম। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা কিংবা প্রয়োজন হলে সহায়তা চাওয়াও মানসিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জীবনের জন্য
মি টাইমের অর্থ দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। নিজের মনকে সময় আর ক্লান্তিকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ছোট ছোট আনন্দকে জীবনের অংশ করে নেওয়া মানুষকে আরও স্থির, সংবেদনশীল ও কর্মক্ষম করে তোলে।
প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টা থেকে নিজের জন্য মাত্র ১৫ বা ২০ মিনিট আলাদা করে রাখাও হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। কারণ, পৃথিবীর সব সম্পর্কের আগে যে সম্পর্ক সুস্থ থাকা জরুরি, সেটি নিজের সঙ্গে নিজ সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে সহজ, অথচ কার্যকর উপায়— একটু মি টাইম।









