ভুয়া ভিডিওতে বিভ্রান্তি: ইরানে নেই কোনো বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী

ছবিঃ আগামীর সময়
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বাড়ছে অপতথ্যের স্রোত। আগে যেখানে পুরোনো ভিডিও বা ভিন্ন ঘটনার ফুটেজ নতুন করে ছড়ানো হতো, এখন সেই জায়গা দখল করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ নতুন ভিডিও। আর এই নতুন প্রবণতার শিকার হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও।
সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে- জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইরানে অবস্থান করছে। কোথাও দেখা যাচ্ছে ইফতার বিতরণ, কোথাও তেলবাহী জাহাজ পাহারা, আবার কোথাও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সেনাসদস্যরা। ভিডিওগুলোর ভাষ্যও একই ধরনের- ভ্রাতৃত্ব, মানবিকতা আর ধর্মীয় আবেগে ভরপুর।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব ভিডিওর কোনো ভিত্তি নেই। বরং এগুলো অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে, যা সাধারণ দর্শকের কাছে বাস্তব বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
“ডেইলি স্পার্ক” নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে অন্তত ১৬টি এমন ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। প্রতিটি ভিডিওর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫ সেকেন্ড। দৃশ্যপট ভিন্ন হলেও কাঠামো প্রায় অভিন্ন- বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আদলে ইউনিফর্ম, জাতিসংঘের নীল বেরেট, হাতে মাইক্রোফোন, আর পেছনে ‘সামাজিক কাজের’ দৃশ্য।
এক ভিডিওতে দেখা যায়, একজন সেনা কর্মকর্তা বলছেন, রমজান উপলক্ষে তিন শতাধিক মানুষের মাঝে ইফতার বিতরণ করা হচ্ছে। অন্য এক ভিডিওতে দাবি করা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজের নিরাপত্তা দিচ্ছে সেনাবাহিনী।
ভিডিওগুলোর ভাষা ও উপস্থাপন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে দর্শকের আবেগ স্পর্শ করে এবং দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়। ফলে অনেকেই এগুলোকে সত্য ভেবে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করছেন।
ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিটির কোণায় ‘VEO’ নামের একটি জলছাপ রয়েছে। এটি গুগলের একটি এআই ভিডিও জেনারেশন টুল, যা লিখিত নির্দেশনা থেকে বাস্তবসম্মত ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম।
আরও নিশ্চিত হতে ভিডিওগুলো গুগলের এআই শনাক্তকারী টুল ‘SynthID’ দিয়ে পরীক্ষা করা হলে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে- ভিডিওগুলোর অডিও ও ভিজ্যুয়াল উভয়ই এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত। পুরো ভিডিও জুড়েই শনাক্ত হয়েছে ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক।
বাস্তবে নেই এমন কোনো মিশন
জাতিসংঘের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ১১টি শান্তিরক্ষা মিশন চালু রয়েছে। তবে এর একটিও ইরানে নয়। দেশটিতে জাতিসংঘের একমাত্র মিশন ‘UNIMOG’ বহু আগেই, ১৯৯১ সালে শেষ হয়েছে। অর্থাৎ, ইরানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের দাবিটি পুরোপুরি মনগড়া।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, “ডেইলি স্পার্ক” পেজটি খুব সম্প্রতি চালু হলেও এর ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
একই ধরনের কনটেন্ট ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা, নির্দিষ্ট আবেগঘন বার্তা ব্যবহার এবং এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ- সব মিলিয়ে এটি পরিকল্পিত অপতথ্য প্রচারের ইঙ্গিত দেয়।
শুধু ইরান ইস্যুই নয়, পেজটি থেকে অন্য ঘটনাতেও এআই ভিডিও ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানোর নজির পাওয়া গেছে।
নতুন চ্যালেঞ্জ: এআই অপতথ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় এখন যে কেউ খুব কম সময়ে বিশ্বাসযোগ্য দেখায় এমন ভুয়া ভিডিও তৈরি করতে পারছে। ফলে অপতথ্য শনাক্ত করা আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো ভিডিও বা দাবি বিশ্বাস না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে আবেগনির্ভর বা চটকদার বার্তাসমৃদ্ধ কনটেন্টের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
সুতরাং, ইরানে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাজ করছে- এমন কোনো তথ্যের বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভিডিওর মাধ্যমে একটি ভুয়া বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল যুগে তথ্যের পাশাপাশি অপতথ্যও সমান গতিতে ছড়ায়- এই বাস্তবতায় সচেতনতা ও যাচাই-সংস্কৃতিই হতে পারে একমাত্র প্রতিরোধ।



