‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’র মতো ঈদ নিয়ে গান হয় না কেন?

সাবিনা ইয়াসমিন, ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ গানের দৃশ্য ও হাবিব ওয়াহিদের ছবির কোলাজ
বাসের জানালার পাশে বসে আছেন জোবায়ের। মোবাইলের স্পিকারে ভেসে আসছে— ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার।’ ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরা মানুষের অপেক্ষা, আনন্দ আর দীর্ঘশ্বাস যেন মিশে আছে এই গানের প্রতিটি লাইনে। পাশে বসা ফারুক কথার সূত্র ধরলেন, ‘আমাদের দেশে ঈদকে কেন্দ্র করে গান তেমন হলো কই?’ জোবায়েরও একমত, ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’ ছাড়া এমন কোন গান আছে, যেটা শুনলেই ঈদের আমেজ পাওয়া যায়?
দুজনই গুগলে খুঁজতে শুরু করলেন। কিছু গান মিলল— সৈয়দ আবদুল হাদীর গাওয়া ‘চাঁদের পালকী চড়ে/আসলো আবার ঘরে/বলো ঈদ মোবারক’, শাকিব খান অভিনীত ‘পাসওয়ার্ড’ চলচ্চিত্রের ‘ঈদ মোবারক’ এবং ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার ‘কোরবানি’। অডিওতে স্বাধীনভাবে প্রকাশিত ঈদ নিয়ে কিছু গান আছে। কিন্তু সেগুলোর শ্রোতার মুখে মুখে থাকেনি।
এবারের ঈদুল আজহা উপলক্ষে বেশ কিছু নতুন গান প্রকাশিত হয়েছে। জনপ্রিয় শিল্পীরা যেমন গান বের করেছেন, তেমনই নবীনরা নতুন গান নিয়ে হাজির হয়েছেন। কিন্তু ঈদবিষয়ক গান নেই একটিও। গত ঈদুল ফিতরেও ছিল একই চিত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোয়ে হাতেগোনা কয়েকটি গান প্রকাশিত হলেও শ্রোতাদের মনোযোগ কাড়তে পারেনি। প্রশ্ন উঠেছে— দেশে ঈদ উৎসবকে ঘিরে গান হয় না কেন?
বাংলাদেশে ঈদ উৎসবকে ঘিরে গান খুব বেশি হয়নি— এটা স্বীকার করেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। অনেক কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের এই গায়িকার মুখে এ নিয়ে আক্ষেপ ঝরল। তিনি বললেন, ‘আমি পরিকল্পনাকারী না, আমি গায়িকা। কেউ যদি ভালো কথা ও সুর নিয়ে আসে, আমি গান গাই। কিন্তু পরিকল্পনা তো কাউকে করতে হবে। ঈদ নিয়ে গান হয়নি এমন কিন্তু না, তবে সময়কে অতিক্রম করে টিকে থেকেছে খুব কম। একটা ভালো গানের জন্য কথা আর সুর— দুটি গুরুত্বপূর্ণ। যখন গানের রমরমা বাজার ছিল, তখনো তো খুব একটা হয়নি। আমিও ঈদ নিয়ে কিছু গান গেয়েছি। সেগুলো হয়তো সময়কে অতিক্রম করে আজ পর্যন্ত টেকেনি। তবে এমন গান হওয়া উচিত। আপনাদের প্রশ্ন শোনার পর আমার মনে হলো, এখনো উৎসবের গান গাইতে পারলে মন্দ হতো না। কিন্তু কার কাছে বলব। কাউকে বলার মতো খুঁজে পাচ্ছি না। কে লিখবেন, কে সুর করবেন?’
সাবিনা ইয়াসমিনের দৃষ্টিতে, ‘এখন গোটা সংগীতজগতেই যেন এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নতুন গান কম হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা নিয়েও কাজ কম।’
যেভাবে ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি’ গানের জন্ম
ঈদ আনন্দকে কেন্দ্র করে সাজানো অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’। ২০০৯ সালে গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের জন্য তৈরি হয়েছিল এটি। সময়ের সঙ্গে এটি কেবল বিজ্ঞাপনের থিম সং হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে ঘরমুখো মানুষের আবেগের প্রতিচ্ছবি। ঈদের ছুটিতে বাস, ট্রেন, লঞ্চে বাজতে শোনা যায় গানটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাত্রাপথের ছবি পোস্ট করে অনেকে লেখেন— ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি।’ গানটির গীতিকার আনিকা মাহজাবিন বললেন, ‘সংকটের মধ্যে আমরা শিকড়ের সংযোগ খুঁজে ফিরি। ছোটবেলার নরম আবেগের মধ্যে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। সেই আবেগই সম্ভবত গানটিকে টিকিয়ে রেখেছে দেড় দশকের বেশি সময়।’
২০০৯ সালের ঈদের আগে খুব অল্প সময়ে একটি বিজ্ঞাপন তৈরির পরিকল্পনা চলছিল। তখন গ্রামীণফোনে কর্মরত ছিলেন আনিকা মাহজাবিন। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বললেন, খন্দকার আশরাফুল হক সরোজ এক দিন বললেন, ‘কিছু একটা করতে হবে।’ তখনই লিখলাম— ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার।’ এরপর গানটির সুর ও সংগীতায়োজনের দায়িত্ব যায় হাবিব ওয়াহিদের কাছে। ধানমন্ডির হোম স্টুডিওতে গানটির লিরিক হাতে পান শিল্পী মিলন মাহমুদ। গায়কের ভাষ্য, “সুর করার পর হাবিব নিজেই গাইছিল। আমি বললাম, তোমার কণ্ঠেই তো ভালো হচ্ছে। ও বলল, ‘ভাই, আপনি ভয়েসটা দিয়ে দেখেন।’ পরে যখন গাইলাম, পুরো অনুভূতিটাই বদলে গেল।”



