বিশ্বব্যাপী নতুন রেকর্ড গড়ল ‘মাইকেল’, সিক্যুয়েলের ব্যাপক সম্ভাবনা

‘মাইকেল’-এর দৃশ্যে জাফার জ্যাকসন (ছবি: লায়ন্সগেট ফিল্মস)
প্রয়াত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিক অভাবনীয় ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়ে রেকর্ড বুক ওলোট পালোট করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে ঝড় তুলে মুক্তির প্রথম পাঁচ দিনে ২১ কোটি ৭৪ লাখ ডলার আয় করেছে ‘মাইকেল’। ফলে অ্যান্টোয়ান ফুকুয়া পরিচালিত সংগীতনির্ভর ছবিটির দ্বিতীয় কিস্তি তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রথমটির গল্প যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে থেকেই শুরু হবে আগামী পর্ব। ‘থ্রিলার’ গায়কের জীবনের শেষ সময়ের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হতে পারে এতে।
বায়োপিকের ক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বোচ্চ ওপেনিং পেয়েছে ‘মাইকেল’। গত ২২ এপ্রিল যুক্তরাজ্যে এবং শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী মুক্তির পর এর টিকিট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকার। এতেই বোঝা যায়, বিপুলসংখ্যক দর্শক দারুণ উপভোগ করছেন ছবিটি। যদিও সমালোচকদের অনেকেই মন্তব্য করেন, এতে শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগসহ জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। রটেন টমেটোসে সমালোচকরা যেখানে ৩৮ শতাংশ গড় স্কোর দিয়েছেন, সেখানে দর্শকদের ৯৭ শতাংশ গড় রেটিং পেয়েছে ছবিটি।
২০১৮ সালে কুইন ব্যান্ডের গায়ক ফ্রেডি মার্কারির বায়োপিক ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’ ১২ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে। সংগীতনির্ভর বায়োপিকের ক্ষেত্রে এটাই ছিল বক্স অফিসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। সেটি টপকে যাওয়ার পাশাপাশি ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ওপেনহাইমার’-এর ১৮ কোটি ডলারের আয়কে ছাড়িয়ে গেছে ‘মাইকেল’। ফলে যেকোনো ধরনের বায়োপিকের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ ওপেনিংয়ের রেকর্ড গড়েছে ছবিটি।
‘মাইকেল’ নির্মাণে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে প্রয়াত পপতারকার এস্টেট। ছবিটিতে তার প্রকৃত কণ্ঠে গাওয়া গানগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৮২ সালের ‘থ্রিলার’ অ্যালবামের গান ‘বিলি জিন’, ‘বিট ইট’ ও ‘থ্রিলার’।
পরিচালকের বয়ানে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিকই আমেরিকান নির্মাতা অ্যান্টোয়ান ফুকুয়ার ক্যারিয়ারে যোগ করেছে নতুন মাইলফলক। এটাই তার পরিচালিত সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র হতে যাচ্ছে। ফলে ‘মাইকেল’-এর দ্বিতীয় কিস্তি নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। তার তথ্যানুযায়ী, প্রথম পর্ব নির্মাণের জন্য প্রচুর ফুটেজ ধারণ করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশ আগামীতে দ্বিতীয় কিস্তিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি নিজেই সেটি পরিচালনা করতে চান।
অ্যান্টোয়ান ফুকুয়ার ক্যারিয়ার শুরু গানের ভিডিও নির্মাণ করে। টনি ব্র্যাক্সটন, স্টিভি ওয়ান্ডার ও প্রিন্সের মতো তারকাদের মিউজিক ভিডিওর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। ১৯৯৮ সালে মুক্তি পায় তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘দ্য রিপ্লেসমেন্ট কিলার্স’। এরপর একে একে তিনি বানিয়েছেন ‘কিং আর্থার’, ‘দ্য ইকুয়ালাইজার’। তবে সবকটিকে ছাপিয়ে গেছে ‘মাইকেল’-এর ব্যবসায়িক সাফল্য। যদিও অ্যান্টোয়ান ফুকুয়া জানান, ছবিটির সব কাজ সম্পন্ন করে মুক্তি দেওয়াটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একের পর এক ধাক্কা এসে বাধাগ্রস্ত করেছে শুটিং।
নব্বই দশকে মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলা জর্ডান চ্যান্ডলারকে নিয়ে ছবির শেষ অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু সমঝোতা চুক্তির কারণে সেটি শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়নি। তাই শেষাংশ নতুনভাবে ধারণ করতে হয়েছে। এজন্য অতিরিক্ত প্রায় ৫ কোটি ডলার খরচ করেছে লায়ন্সগেট ফিল্মস এবং ইউনিভার্সেল পিকচার্স। ফলে মোট নির্মাণ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি ডলার। এটি সর্বকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বায়োপিকের মধ্যে অন্যতম।
অতিরিক্ত শুটিংয়ের কারণে ফুকুয়াকে প্রায় ২০ দিন বেশি সময় দিতে গিয়ে অন্য কাজ হাতছাড়া করতে হয়েছে। এমন বিরূপ অভিজ্ঞতা তার কাছে মানসিকভাবে কঠিন ছিল। তিনি জানান, এর আগেও একটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষের সময় হঠাৎ একটি বিতর্ক পুরো পরিস্থিতি বদলে দিয়েছিল। ‘মাইকেল’-এর ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সংস্করণ জমা দেওয়ার সময় এমন প্রতিকূলতা তৈরি হওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তখন সবকিছু নতুন করে ভাবতে হয়েছে।
অবশ্য বাধা সত্ত্বেও ফুকুয়ার লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার। মাইকেল জ্যাকসনকে শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি। তার মতে, ‘নতুন প্রজন্মের অনেকেই মাইকেলের প্রকৃত গল্প জানে না। তাই ছবিটিতে পপসম্রাটের গানের জাদুর পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ভয়, অনিশ্চয়তা, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।’
ছবিটিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে বাবা জো জ্যাকসনের সঙ্গে মাইকেলের সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের টানাপোড়েন কীভাবে মাইকেলের জীবনে প্রভাব ফেলেছিল, সেটাই বড় পর্দায় দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে উঠে এসেছে তার সহানুভূতিশীল দিক। যেমন প্রাণীদের প্রতি তার ভালোবাসা।
চিত্রনাট্যকার জন লগ্যানের সঙ্গে আলোচনা করে ফুকুয়া সিদ্ধান্ত নেন, প্রথম ছবিতে মাইকেলের বিরুদ্ধে ওঠা বিতর্ক দেখানো হবে না। এটি হবে তার গড়ে ওঠার গল্প। তবে আগামীতে সম্ভাব্য দ্বিতীয় কিস্তির জন্য কিছু ইঙ্গিত রাখা হয়েছে। যেমন ওষুধের ওপর নির্ভরতা এবং জীবনের শেষ দিকে তার নিদারুণ পরিস্থিতি।
‘মাইকেল’-এ নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাইকেল জ্যাকসনের ভাইয়ের ছেলে জাফার জ্যাকসন। শুরুতে এই তরুণের একটি ছবি দেখে বিস্মিত ফুকুয়ার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘এ তো হুবহু মাইকেল জ্যাকসন!’
শুটিংয়ের বাইরেও জাফার জ্যাকসন সবসময় মাইকেলের চরিত্রে ডুবে থাকতেন। চাচার কথাবার্তা, হাঁটাসহ সবকিছু রপ্ত করতে কাটিয়েছেন লম্বা সময়। শুটিংয়ের সময় বড় আয়োজন, হাজারো অতিরিক্ত শিল্পী এবং বিশাল সেটে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন জাফার। ফুকুয়া জানান, নাচের অনুশীলনে পা থেকে রক্ত বের হলেও তিনি থামেননি।







