দৃশ্য
বাংলার চিরন্তন বরিষণ

পথের পাঁচালী। চলচ্চিত্রকার: সত্যজিৎ রায়
ক্লোজআপ শটে মধ্যবয়সী এক লোকের নিচু করে রাখা মাথা। তার তালুর টাকে টুপ করে পড়ল এক ফোঁটা পানি। তারপর আরেক ফোঁটা। চকিতে মাথা উঠিয়ে টাকে হাত রাখলেন তিনি। ফুল ফ্রেমে দেখা গেল, পুকুরের সামনে বসেছিলেন লোকটি; পাশে মাটিতে ছাতা গেঁথে রেখে। তারপর তাকালেন আকাশের দিকে। ছাতা তুলে নিলেন হাতে। মেলে ধরলেন মাথার ওপর। আর বৃষ্টির বেগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল।
বৃষ্টি যেন খইয়ের মতো ফুটতে থাকল পুকুরের জলে। রূপ নিল মুষলধারে। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ছুটছে শিশু অপু। ছুটছে একটি কুকুরও। ভিজে চুপচুপে হয়ে যাওয়া অপু বৃথা আশ্রয় নিল গাছের নিচে। কুকুরটি খুঁজে নিল চালাঘর। কিন্তু কিশোরী দুর্গার আশ্রয়ের ভাবনা নেই। দারুণ সম্মোহনে উপভোগ করছে সে বৃষ্টির আদর। খোলা জায়গায় প্রথমে উবু হয়ে থেকে; তারপর চুল ঝাড়া দিয়ে। ক্লোজআপ শটে তাকে দেখা গেল, সারা মুখে মেখে নিচ্ছে বৃষ্টির সুধা। অবাক হয়ে অপু দেখছে বড় বোনের এমন পাগলপনা।
ঘুরে ঘুরে নাচলও দুর্গা। তারপর ছুটে গিয়ে ছোট ভাইকে জড়িয়ে নিল আঁচলে। দূরে অজ্ঞাত এক শিশুকেও দেখা গেল, গাছের নিচে বসে অপেক্ষমাণ বৃষ্টি থামার। এদিকে অপু-দুর্গার মা জঙ্গল থেকে কচু ডগা নিয়ে ফিরছেন ঘরে। চলতি পথে নারকেল পড়ে থাকতে দেখে চোরের মতো চারপাশে চোখ বুলিয়ে তুলে নিলেন। সততার সঙ্গে জীবন কাটাতে চাওয়া, অথচ বাস্তবতার রূঢ়তায় কালেভদ্রে চৌর্যবৃত্তির আশ্রয় নেওয়া বাংলার চিরন্তন যেকোনো জননীর মতোই অভিব্যক্তি তার। একসঙ্গে জীবনের নানা রূপ হাজির করার এই নয়নাভিরাম বৃষ্টির দৃশ্য সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র। এই বৃষ্টি নতুন জীবনের আহ্বান; কেননা, এর স্পর্শে বৃক্ষরাজি খলবল করছে। এই বৃষ্টি মৃত্যুর দূত; কেননা, এতে ভিজে জ্বর এসে দুর্গার প্রাণের ঘটবে অবসান। এই বৃষ্টি এককথায় চলচ্চিত্র মাধ্যমে বাংলার চিরায়ত বর্ষা প্রকৃতির নিখুঁত প্রকাশ। জাপানি মাস্টার ফিল্মমেকার যেমনটা বলেছেন, সত্যজিতের সিনেমা না দেখা মানে পৃথিবীতে থেকেও চন্দ্র ও সূর্যের দেখা না পাওয়া। এই দৃশ্য সেই দাবির জোরালো সত্যতা তুলে ধরে।




