পরীক্ষার হলে ব্লুটুথ ও গোপন ডিভাইসের ব্যবহারে তাৎক্ষণিক শাস্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বদলেছে সময়। খাতা-কলমের সনাতন পরীক্ষা পদ্ধতিতে লেগেছে ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার হাত ধরে বদলেছে অপরাধের ধরনও। ফেসবুকে গ্রুপ খুলে প্রশ্ন ফাঁস কিংবা পরীক্ষার হলে গোপন ডিভাইসের ব্যবহার এখন শিক্ষা খাতের বড় উদ্বেগের কারণ। যুগের এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না চার দশকের বেশি সময়ের পুরনো আইনি কাঠামো। ফলে তৈরি হচ্ছে আইনি ফাঁকফোকর। এই অচলাবস্থা ভাঙতে এবার ঢেলে সাজানো হচ্ছে পরীক্ষা-সংক্রান্ত আইনকে।
দেশে বর্তমানে কার্যকর রয়েছে ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন। যদিও শিক্ষা বোর্ডগুলো ১৯৬১ সালের অর্ডিন্যান্সের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
দীর্ঘ ৪৫ বছর আগের এই আইনে ডিজিটাল প্রযুক্তির কোনো উল্লেখ নেই। তৎকালীন সময়ে অপরাধের পরিধি ছিল সীমিত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনলাইনে চলে নানা প্রতারণা। সংঘবদ্ধ চক্র ডিজিটাল উপায়ে চেষ্টা করে পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তনের। প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন জালিয়াতি রোধেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
আইনটি যুগোপযোগী করতে প্রণয়ন হয়েছে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৈরি এই খসড়া এরই মধ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে মন্ত্রিসভায়। এর আগে গত ২ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি পায় নীতিগত অনুমোদন। পরে সম্পন্ন হয়েছে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং। এখন এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য রয়েছে শেষ ধাপে।
পরীক্ষায় অপরাধের ধরন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব, ডিজিটাল প্রতারণা, ব্লুটুথ ডিভাইসের ব্যবহার এবং ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টার মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
-অধ্যাপক কামাল উদ্দিন হায়দার, সচিব, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, খসড়া আইন প্রণয়নের আগে হয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা। জনমত যাচাইয়ে এটি প্রকাশ করা হয়েছিল বিভাগের ওয়েবসাইটেও।
ডিজিটাল ম্যানিপুলেশনের আসছে কঠোর শাস্তি
বর্তমান আইনে শুধু পাবলিক পরীক্ষা, যেমন— এসএসসি-এইচএসসি বোঝানো হয়। সেই আইন দিয়ে পাবলিক পরীক্ষার শাস্তি দেওয়া যায়। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা, স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নকল বা প্রশ্ন ফাঁস করলে পরীক্ষা আইনে কোনো শাস্তির বিধান ছিল না। নতুন আইনে এসব পরীক্ষাকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
নতুন আইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের স্পষ্টীকরণ। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে জানালেন, নতুন আইনে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ শব্দটিকে প্রথমবারের মতো সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে। এর ফলে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, নম্বর, মেধাতালিকা কিংবা পরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য হ্যাকিং, পরিবর্তন বা বিকৃতের চেষ্টা বিবেচিত হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণে হবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড। পাশাপাশি থাকছে অর্থদণ্ডের বিধানও। এ ছাড়া সংঘবদ্ধভাবে পরীক্ষা জালিয়াতি, প্রশ্ন ফাঁস বা গুজব ছড়ানো— এ ধরনের অপরাধে চক্র গঠনের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে কঠোর শাস্তির প্রস্তাব।
বাড়ল শাস্তির আওতায়
পাবলিক পরীক্ষা আইন ১৯৮০, যা ১৯৯২ সালে সংশোধিত হয়। ওই আইনে প্রশ্ন ফাঁস বা জালিয়াতির সর্বোচ্চ শাস্তি ৪ থেকে ১০ বছর থাকলেও তা ছিল কাগজের প্রশ্নপত্র চুরি বা ফাঁসের ক্ষেত্রে। অনলাইন হ্যাকিংয়ের কোনো ধারণাই ছিল না। এর সঙ্গে হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো বা ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনা। এসব অপরাধকে শাস্তির আওতায় আনতে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারাও ছিল না। নতুন করে ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন ধারা যুক্ত করে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। এটিই এই আইনের সবচেয়ে বড় ও কঠোর পরিবর্তন।
কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কোচিং সেন্টার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার কোনো কাঠামো ছিল না। আর্থিক জরিমানা ছিল নামমাত্র কয়েক হাজার টাকা মাত্র। প্রস্তাবিত নতুন আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার বা কোনো চক্র জড়িত প্রমাণিত হলে ১০ বছরের সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমান আইনে প্রশ্ন ফাঁসের অপরাধের ক্ষেত্রে জামিন পাওয়া সহজ ছিল, বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘমেয়াদি। নতুন আইনে এসব নতুন অপরাধকে অজামিনযোগ্য এবং বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারযোগ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ পুলিশ সন্দেহভাজনদের ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে।
অর্থাৎ নতুন আইনে সাজায় নতুন ধরন এবং সর্বোচ্চ সাজা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে, সাইবার অপরাধীদের দমনে সাজা সুনির্দিষ্টকরণ, কেন্দ্রে ব্লুটুথ বা গোপন ডিভাইস ব্যবহারে সরাসরি জেল, প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ রুখতে বিশাল আর্থিক দণ্ড রাখা হয়েছে।
নতুন আইনটি সংসদে পাস হলে ফেসবুকে গ্রুপ, হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্নের ছবি বা ভুয়া তথ্য ছড়ালে কিংবা কম্পিউটারে ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা করলেই সরাসরি ৫ থেকে ১০ বছরের জেল এবং কোটি টাকার আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে হবে অপরাধীদের।
সরকারের এমন পদক্ষেপের পেছনে ভূমিকা রেখেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি ঘটনা। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরুর আগের দিন ফেসবুকে ‘SSC-2026 Question Paper Leak Group’-এর পেজ খুলে প্রশ্ন ফাঁসের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায় একটি আপরাধ চক্র। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে চক্রটির কয়েকজন সদস্যকে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা না ঘটলেও গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের প্রবণতা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে।
পরীক্ষা কেন্দ্রেও অসদুপায় অবলম্বনের ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি পুরোপুরি। গত ২১ এপ্রিল শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে নকলের দায়ে বহিষ্কার করা হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে। তাদের মধ্যে যেমন ছিলেন সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থী, তেমনি বাদ পড়েননি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীও। এর আগে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার চতুর্থ দিনে নকলের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয় ৪৩ পরীক্ষার্থীকে; শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় চারজন কক্ষ পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও। এগুলোসহ এমন আরও অনেক ঘটনার কথা তুলে ধরে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু পরীক্ষার্থী নয়, প্রয়োজন রয়েছে অসদুপায়ে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে জোরদার করেছে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় নজরদারি। গত ১০ এপ্রিল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নকলমুক্তভাবে সম্পন্নে কঠোর বার্তা দেন। তিনি প্রতিটি পরীক্ষা কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, প্রশ্নপত্র পরিবহন ও সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি নিশ্চিতে দেন গুরুত্ব।
“নতুন আইনে ‘ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন’ শব্দটিকে প্রথমবারের মতো সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে। এর ফলে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, নম্বর, মেধাতালিকা কিংবা পরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য হ্যাকিং, পরিবর্তন বা বিকৃতের চেষ্টা বিবেচিত হবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণে হবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড। পাশাপাশি থাকছে অর্থদণ্ডের বিধানও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে পাবলিক পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে নজরদারি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল মনিটরিং, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকায় নকল ও প্রশ্ন ফাঁসের প্রবণতাও এসেছে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে অপরাধের ধরন হচ্ছে পরিবর্তিত। ফলে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, কেবল হলের ভেতর নজরদারি করলেই হবে না; সাইবার অপরাধ এবং অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা মোকাবিলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন আইনি কাঠামো সাহায্য করবে সেই চ্যালেঞ্জ জয় করতে। কঠোর শাস্তির পাশাপাশি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত হলে পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বাড়বে জনআস্থা। সংশোধিত আইন পরীক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে করবে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার আগামীর সময়কে বলেছেন, পরীক্ষায় অপরাধের ধরন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব, ডিজিটাল প্রতারণা, ব্লুটুথ ডিভাইসের ব্যবহার এবং ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টার মতো নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
‘এসব অপরাধ মোকাবিলায় যুগোপযোগী আইন অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। প্রস্তাবিত সংশোধনী আইনে শুধু শাস্তি বাড়ানোই উদ্দেশ্য নয়, বরং পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করাও এর লক্ষ্য’, যোগ করেন শিক্ষা বোর্ডের সচিব।
কর্তৃপক্ষের নজরদারির বিষয়টি জানিয়ে অধ্যাপক কামাল হায়দার বলছিলেন, বর্তমানে শিক্ষাবোর্ডগুলো সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল মনিটরিং এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে পরীক্ষা পরিচালনা করছে। নতুন আইন কার্যকর হলে প্রশ্নফাঁস, সাইবার জালিয়াতি ও অসাধু চক্রের তৎপরতা আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।




