শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক পিএসের রাজত্ব শিক্ষা প্রশাসনে
- পিএস পদ ছাড়তেই মিলল ডিজির চেয়ার
- ১৬তম ব্যাচের একচ্ছত্র আধিপত্য
- এনসিটিবি, বোর্ড, নায়েমেও খোঁজা হচ্ছে সোহেলপন্থিদের

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
অধ্যাপক নাজমুল হক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ এবং প্রশাসন শাখার পরিচালক-বিসিএস শিক্ষার ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা। দপ্তরটির অর্থ ও ক্রয় উইংয়ের পরিচালক মনির হোসেন পাটওয়ারী- তিনিও একই ব্যাচের। প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালক আনোয়ার হোসেনের ব্যাচও ১৬।
শিক্ষা প্রশাসনে ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তাদের জড়ো করছেন শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের একান্ত সচিবের (পিএস) পদ থেকে পদত্যাগ করা ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। এমন অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা প্রশাসনের অন্দরেই। তিনিও ওই ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা। শিক্ষামন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের ‘পরীক্ষিত’ বলে পরিচিত সোহেল- রয়েছেন অধিদপ্তরটির মহাপরিচালক (ডিজি) হওয়ার পাইপলাইনে। সম্প্রতি তাকে দেওয়া হয় অধিদপ্তরটির মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব।
শিক্ষামন্ত্রীর পিএসের নিয়ন্ত্রণের ছবিটি নতুন সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ভালো নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মত, যেসব পদে ১৬ ব্যাচের কর্মকর্তাদের বসানো হচ্ছে, সেগুলো দায়িত্বহীন দায়িত্ব নয়, এসবে রয়েছে অর্থের নিশ্চিন্ত সরবরাহ। কাজেই এসব পদে পদায়ন করা দরকার যোগ্যতার নিরিখে যাচাই করেই।
শিক্ষামন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এই কর্মকর্তা নিজের ইচ্ছামতো সাজাচ্ছেন গোটা শিক্ষা প্রশাসন। ১৬তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের এই কর্মকর্তার প্রভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ১৪তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ অনেক কর্মকর্তা। আর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর দখল দিচ্ছেন ব্যাচমেটদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাউশি করিডোরে ফিসফাস- শিক্ষা প্রশাসনে এখনো গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যাচভিত্তিক আনুগত্য। পিএস সোহেল নিজের প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বসাচ্ছেন নিজের ব্যাচমেটদের। মাউশি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), শিক্ষা বোর্ড কিংবা নায়েম- শীর্ষ সব পদে ১৬ ব্যাচের ছায়া। জ্যেষ্ঠতার বা মেধার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে ‘সোহেলের গুডবুকে’ থাকাটা ।
অভিযোগের বিষয়ে অকপট ড. সোহেল, ‘১৪ ও ১৬তম ব্যাচ কাছাকাছি সময়ে প্রবেশ করেছে চাকরিতে। প্রশাসনে সমমান পদে কাজ করছেন দীর্ঘদিন। তাছাড়া আমার ব্যাচমেট পদায়ন পেতেই পারেন- যদি তারা হন যোগ্য। কিন্তু তা যদি আমার ওপর এসে পড়ে- তবে তা হবে খুবই দুঃখজনক।’
১৪তম ব্যাচের সিনিয়রদের ডিঙিয়ে ১৬ ব্যাচের জুনিয়রদের পদায়ন প্রসঙ্গে তার মত, ‘১৪তম ব্যাচটি বড়। তারা প্রশাসন, কলেজ সব জায়গায় পদায়ন পেয়েছেন একচেটিয়া। এবার অন্য ব্যাচ পেলে দোষের কিছু না।’
শিক্ষা প্রশাসনের অন্দর মহলে নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে গত দুই মাসে। অভিযোগ- এসবের নেপথ্যে রয়েছেন এই সোহেল। শিক্ষামন্ত্রীর পিএস থেকে মাউশির ডিজি হতেও ঘটেছে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের মতো গুরুতর ঘটনা।
বৃহস্পতিবার শিক্ষামন্ত্রীর পিএস পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ড. সোহেল। পদত্যাগের একঘণ্টা পরেই মাউশি ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। এই পদত্যাগকে ডিজি হওয়ার কৌশল বলেই মনে করছেন কেউ কেউ। ডিজির ফাইলটি এখন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায়। আর সেই পথে পিএস পদটি যেন বাধার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়- সেজন্যই তিনি ছেড়েছেন এই পদ। যদিও এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘পদত্যাগ করেছি স্বেচ্ছায়।’
ছয় মাস ধরে শূন্য মাউশির ডিজি পদ। এর মধ্যে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিএম হান্নাকে সরিয়ে দেওয়া হয় ১৩ এপ্রিল। ১৪তম ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে সরানোর পর আরও জটিল হয় পরিস্থিতি।
নিয়ম অনুযায়ী ‘মোস্ট সিনিয়র’ হিসেবে মনিটরিং উইংয়ের পরিচালক প্রফেসর কাজী কাইয়ুম শিশিরের ডিজির দায়িত্ব পাওয়ার কথা। তিনিও ১৪তম ব্যাচের। পর্দার অন্তরালে কলকাঠি নেড়ে তা রুখে দেয় ১৬তম ব্যাচের ‘সিন্ডিকেট’, যার নেতৃত্বে সোহেল।
আলোচনায় ছিলেন ১৪তম ব্যাচের প্রফেসর আব্দুর সবুরও। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুপারিশ ছিল তার জন্য। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক ইউনেসকোর অনুষ্ঠানে প্যারিস অবস্থানের সুযোগে সেই ফাইল যায় আটকে। এই সুযোগে সোহেল নিজেই ডিজির অতিরিক্ত দায়িত্ব নেন বাগিয়ে।
২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর ড. সোহেল মাউশির মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক হওয়ার পর থেকেই শিক্ষা প্রশাসনে শুরু হয় ১৬তম ব্যাচের একচ্ছত্র আধিপত্য। সেই থেকেই জ্যেষ্ঠতার নিয়ম উপেক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ সব উইংয়ে নিজের ব্যাচমেটদের বসাচ্ছেন তিনি। এমন অভিযোগ সিনিয়র কর্মকর্তাদের।
এর মধ্যে গত সোমবার কলেজ ও প্রশাসন শাখায় আনা হয় ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা প্রফেসর নাজমুল হককে। যিনি ২০১৫ সাল থেকে ফরিদপুরের মধুখালীর আইনউদ্দীন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে রয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। মাউশির প্রশিক্ষণ উইংয়ের পরিচালক আনোয়ার হোসেন এবং অর্থ ও ক্রয় উইংয়ের মনির হোসেন পাটওয়ারী সবাই সোহেলের ব্যাচের।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদটি ফাঁকা প্রায় এক বছর। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন একজন সদস্য। তিনি অবসরে যাওয়ার পর গত নভেম্বর থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব আছেন চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে। সেই চেয়ারম্যান পদেও খোঁজা হচ্ছে ১৬তম ব্যাচের কর্মকর্তা।
সর্বশেষ প্রাথমিক ও কারিকুলাম দুটি সদস্য পদে ১৬তম ব্যাচ থেকে মাহমুদুল হক ও ইকবাল হায়দারকে করা হয় পদায়ন। সংস্থাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) পদে ১৮তম ব্যাচ থেকে আনা হয়েছে আবু নাসের টুকুকে। ১৭তম ব্যাচের জাহিদা নাজনীনকে পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক করা হয়। শিক্ষা বোর্ড, নায়েমসহ অন্যান্য দপ্তরে বিভিন্ন পদে শুরু হয়েছে রদবদল। সেখানেও খোঁজা হচ্ছে সোহেলপন্থি কর্মকর্তাদের।
ড. সোহেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের দিয়েছেন আশ্রয়।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শিক্ষা ভবনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেওয়া কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে সোহেলের বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির আহ্বায়ক। সাবেক পিএস এবং আহ্বায়কের প্রভাব খাটিয়ে বজায় রাখছেন নিজের আধিপত্য।
শীর্ষ পদগুলোয় নিয়মিত পদায়ন দেয় না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কাজ চালানোর সংস্কৃতি রয়েছে নতুন সরকারের মধ্যেও।
মাউশি ও এনসিটিবির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্থবিরতা দেখা গেছে এই কারণে। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এনসিটিবিতে নেই নিয়মিত চেয়ারম্যান। মাউশিতেও চলছে রদবদলের অস্থিরতা।

