শেয়ারবাজার
সংস্কারে ‘থ্রি-আর’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিনের মন্দা ও ব্যাংকনির্ভরতা কাটিয়ে শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল ধারায় ফেরাতে পাঁচ বছরের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রণীত ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ দলিলে শেয়ারবাজারের গতি ফেরাতে ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন, রিকনস্ট্রাকশন) কৌশলকে সামনে আনা হয়েছে। সম্প্রতি একনেক সভায় অনুমোদিত এই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা ও বাজার সুশাসনকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
প্রথম বছরে ‘রিকভারি’ ধাপে কড়া তদারকি ও কারসাজি বন্ধ করে বাজারে শৃঙ্খলা আনা, পরবর্তী ‘রিস্টোরেশন’ ধাপে ভালো বন্ড এবং সুকুক এনে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা এবং শেষ ধাপে ‘রিকনস্ট্রাকশন’-এর মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে শেয়ারবাজারকে দেশের মূলধন সংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করাই এই রোডম্যাপের আসল লক্ষ্য।
নীতি নথিতে বলা হয়েছে, বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থা অতিরিক্ত ব্যাংক-নির্ভরশীল হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সম্পদ ও দায়ের মধ্যে বড় ধরনের অসমতা দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে মূলধন বাজারে সুশাসনের চরম ঘাটতি, নিয়মিত বাজার কারসাজি, তথ্য প্রকাশের নিম্নমান এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণের কারণে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এ পরিস্থিতি উত্তরণে আগামী পাঁচ বছরের জন্য তৈরি করা হয়েছে একটি পর্যায়ক্রমিক বাজার সংস্কারের রূপরেখা।
প্রথম কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) স্বাধীনতা, কারিগরি সক্ষমতা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারসাজি রুখতে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানের অডিট ও করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে শুধু ব্যাংকঋণের ওপর ভরসা না করে শেয়ারবাজারে গ্রিন বন্ড, ব্লু বন্ড, সোশ্যাল বন্ড এবং ইসলামিক সুকুক বন্ডের মতো নতুন টেকসই আর্থিক পণ্য চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সহজ হবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টেনে আনা।
তৃতীয়ত, বাজারের অতিরিক্ত অস্থিরতা কমাতে মিউচুয়াল ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড, বীমা ও পেনশন ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তাদের সচেতনতা বাড়ানো এবং নতুন উদীয়মান এসএমই ও স্টার্টআপগুলোর জন্য বিকল্প প্ল্যাটফর্ম থেকে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করা হবে। প্রথম বছরে বাজার স্থিতিশীল করা ও কারসাজি রোধে জোরদার করা হবে বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এ পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের তৈরি হবে শক্তিশালী ভিত্তি।
সরকারের এই মহাপরিকল্পনাকে স্বাগত জানালেও বাজারের মূল সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল আলম। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘আমাদের শেয়ারবাজারের প্রধান সমস্যা হলো ভালো কোনো কোম্পানি এখানে আসতে চায় না। ভালো কোম্পানি আনতে নীতিগত বাধ্যবাধকতা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি নিয়ম করে দেয়, কোনো প্রতিষ্ঠান ১০০ টাকা মূলধন সংস্থান করতে চাইলে তার অন্তত ২৫ টাকা শেয়ারবাজার থেকে তুলতে হবে, তবেই ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে।’
বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ইনসাইডার ট্রেডিং (ভেতরের তথ্যে কারসাজি) বন্ধে কঠোর নজরদারির তাগিদ দিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ ধারণা হলো— এসব কাজ ব্রোকাররা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির দিক থেকেই এটি বেশি হয়। বিগত বছরগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, লভ্যাংশ ঘোষণার আগেই শেয়ারদর বাড়ে, পরে কোনো মুভমেন্ট থাকে না। এর অর্থ কোম্পানির ভেতরের লোকজনরাই এর সঙ্গে জড়িত। বিএসইসিকে বহুবার বিষয়টি বললেও কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিচার হয়নি। কোনো খবরদারি নয়, তবে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে কঠোর তদারকিতে আনতে হবে।’






