রেজিস্ট্রেশন বাতিলে ৬ মার্চেন্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিশেষ তদন্ত

দেশের শেয়ারবাজারের সদস্যভুক্ত ছয়টি মার্চেন্ট ব্যাংকের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (নিবন্ধন সনদ) বাতিলের প্রাথমিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিধিবিধান পরিপালনে ব্যর্থতা এবং অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকাসহ নানা অভিযোগ যাচাই করা হবে। মূলত, শেয়ারবাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন।
সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
তদন্তের আওতায় আসা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, রুটস ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, হাল ক্যাপিটাল লিমিটেড, রিভারস্টোন ক্যাপিটাল লিমিটেড, এনডিবি ক্যাপিটাল লিমিটেড এবং ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেড।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন টিকিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও আইনি শর্ত পূরণ হচ্ছে না। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিএসইসি দুইজন করে কর্মকর্তার সমন্বয়ে পৃথক বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ও ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন থেকে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কমিশনের কাছে উত্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গঠিত কমিটি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম ও আইনি পরিপালন খতিয়ে দেখবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দক্ষতা থেকে শুরু করে মার্জিন রুলস পরিপালন এবং ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কারসাজি বা অনিয়ম হয়েছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তদন্ত কমিটির দায়িত্ব বণ্টনের তথ্য অনুযায়ী, এফএএস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের অনিয়ম খতিয়ে দেখবেন বিএসইসির যুগ্ম পরিচালক অনু দে ও উপ-পরিচালক সিরাজুল ইসলাম। রুটস ইনভেস্টমেন্টের কার্যক্রম পর্যালোচনায় থাকছেন অতিরিক্ত পরিচালক রাকিবুর রহমান ও সহকারী পরিচালক বিভাষ ঘোষ। হাল ক্যাপিটালের তদন্ত করবেন অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান ও সহকারী পরিচালক মো. সাইদুল ইসলাম। একইভাবে রিভারস্টোন ক্যাপিটালের দায়িত্বে থাকছেন অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ এমদাদুল হক ও সহকারী পরিচালক মো. মাসুম বিল্লাহ।
এনডিবি ক্যাপিটালের তদন্তে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া ও সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমানকে। এছাড়া ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটালের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবেন উপ-পরিচালক এস. এম. আহসানুল কবির ও সহকারী পরিচালক মোসা. শাকিলা সুলতানা।
সূত্র জানায়, এবারের তদন্তে কেবল সাধারণ নথিপত্র দেখা হবে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক সক্ষমতা ও আচরণ বিধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ তদন্তের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বাতিলের যৌক্তিকতা যাচাই করা। এছাড়া মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ঠিকমতো কাজ করছে কি না এবং গ্রাহকদের তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা হবে।
এছাড়া শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মার্জিন রুলস কঠোরভাবে মানা হচ্ছে কি না এবং পরিচালনা পর্ষদের সভাগুলো নিয়মিত ও যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কি না, তা-ও তদন্তের মূল কেন্দ্রে থাকবে। পাশাপাশি কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ফি পরিশোধের তথ্য এবং সিকিউরিটিজ আইনে বর্ণিত আচরণ বিধি লঙঘনের কোনো অভিযোগ আছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখা হবে। মূলত বিধিমালার অধীনে বর্ণিত আচরণ বিধি ও শর্তসমূহ যেসব প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত লঙ্ঘন করে আসছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সুপারিশ করবে এ তদন্ত কমিটি।
আরো জানা গেছে, তদন্ত চলাকালে কমিশন চাইলে যেকোনো সময় আরও তথ্য বা কর্মপরিধি বৃদ্ধি করতে পারবে। মূলত বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং শেয়ারবাজারে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই বিএসইসির এই বিশেষ উদ্যোগ।
কমিশনের মতে, এ সিদ্ধান্তের ফলে শেয়ারবাজারে দায়সারাভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হলো। যেসব মার্চেন্ট ব্যাংক বাজারের কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পারছে না বা বছরের পর বছর আইন ভাঙছে, তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হলে স্বচ্ছতা ফিরবে শেয়ারবাজারে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কমিশন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আইন অনুযায়ী।
প্রসঙ্গত, মার্চেন্ট ব্যাংক শেয়ারবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান (ইন্টারমিডিয়ারিজ), যা কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। নতুন নতুন কোম্পানিকে বাজারে আনা, পুঁজি সংগ্রহে সহায়তা এবং বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ প্রদান করে প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া আইপিও পরিচালনা, প্রসপেক্টাস প্রস্তুত, আন্ডাররাইটিং, করপোরেট পরামর্শ ও প্রাইভেট প্লেসমেন্টেরও কাজ করে থাকে।
একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট, বাজার গবেষণা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও বিনিয়োগ পরামর্শ প্রদান করে। কোনো প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের আগে আর্থিক ও আইনগত যাচাইও করে থাকে। চাহিদা ও যোগান—উভয় দিকেই কাজ করে মার্চেন্ট ব্যাংক শেয়ারবাজারকে সক্রিয় ও গতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে শেয়ারবাজারের সদস্যভুক্ত মার্চেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা ৬৬টি।



