শেয়ারবাজারে লুব-রেফের কাগুজে সম্পদ

সংগৃহীত ছবি
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সময় বিনিয়োগকারীদের সামনে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তিন-চার বছর পর সেই স্বপ্নের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক প্রশ্ন। বলা হয়েছিল, আইপিও থেকে তোলা অর্থে গড়ে উঠবে নতুন শিল্প প্রকল্প, আসবে আধুনিক যন্ত্রপাতি, বাড়বে উৎপাদন সক্ষমতা। সেই আশাতেই হাজারো বিনিয়োগকারী নিজের কষ্টার্জিত অর্থ তুলে দিয়েছিলেন লুব-রেফ (বাংলাদেশ) লিমিটেডের হাতে। কিন্তু এখন অভিযোগ উঠেছে, কাগজ-কলমে শত শত কোটি টাকার সম্পদ দেখানো হলেও বাস্তবে এর বড় অংশের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশের পরিচিত ইঞ্জিন অয়েল ব্র্যান্ড বিএনওর উৎপাদক প্রতিষ্ঠান লুব-রেফের (বাংলাদেশ) বিরুদ্ধে গুরুতর এই অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ইসলাম জাহিদ অ্যান্ড কোং। তাদের দাবি, ২০২১ সালে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানিটি প্রায় ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করলেও সেই অর্থের বড় অংশ কোথায় ব্যয় হয়েছে, এর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষকরা আর্থিক বিবরণীতে দেখানো বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও চলমান প্রকল্পের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাননি।
অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে আইপিও তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে। প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের বড় অংশ নতুন যন্ত্রপাতি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরীক্ষকদের ভাষ্য, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কিংবা ব্যয়ের যথাযথ নথিপত্র কোম্পানি দেখাতে পারেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রকৃতপক্ষে কোথায় গেল?
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কোম্পানিটি ৫৮৪ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী সম্পদ দেখালেও যাচাইয়ে অন্তত ১১৪ কোটি টাকার সম্পদের অস্তিত্ব মেলেনি। একইভাবে নতুন প্রকল্পের জন্য ২১২ কোটি টাকার ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) দেখানো হলেও নিরীক্ষকরা কোনো নির্মাণাধীন প্রকল্প বা দৃশ্যমান কাজের প্রমাণ পাননি।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ইসলাম জাহিদ অ্যান্ড কোংয়ের অংশীদার নিরীক্ষক এসএম আব্দুল হামিদ জানিয়েছেন, লুব-রেফ কর্তৃপক্ষ আর্থিক হিসাবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন ৫৮৪ দশমিক ৪০ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদ আছে বলে উল্লেখ করেছে। তবে কোম্পানির শিফট ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতিতে সরেজমিন যাচাইয়ে গিয়ে তারা ১১৪ দশমিক ৯২ কোটি টাকার সম্পদের হদিস পায়নি।
এসএম আব্দুল হামিদের অভিযোগ, লুব-রেফ কর্তৃপক্ষ কোনো নির্মাণাধীন বা ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস ছাড়াই টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভুয়া সম্পদ দেখিয়েছে। তারা আইপিওর টাকা দিয়ে প্রকল্প নির্মাণ করছে বা প্রকল্পের কাজ চলমান হিসেবে ভুয়া তথ্য দিয়ে পুরো টাকা গায়েব করেছে।
হিসাববিদ মনোয়ার হোসেনের মতে, কোনো কোম্পানি যদি কাগজে শত শত কোটি টাকার নির্মাণাধীন প্রকল্প দেখায় অথচ বাস্তবে তার অস্তিত্ব পাওয়া না যায়, তাহলে সেটি শুধু হিসাবের অসংগতি নয়; বরং অর্থ আত্মসাৎ বা ভুয়া সম্পদ প্রদর্শনের আশঙ্কাও তৈরি করে। এ কারণে বিষয়টি এখন শুধু একটি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের প্রশ্ন নয়, বরং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সুশাসনের বিষয় হিসেবেও সামনে এসেছে।
এদিকে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৩৩ কোটি টাকার কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য কিনেছে বলে আর্থিক হিসাবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু মূসক ৯ দশমিক ১ অনুযায়ী ওই অর্থবছরে ৩১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকার কাঁচামাল ও প্যাকেজিং পণ্য কেনা হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২১ সালে শেয়ারবাজারে আসে লুব-রেফ (বাংলাদেশ)। ওই সময় ২০১৯-২০ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি ২ দশমিক ৫৬ টাকা মুনাফা দেখানো কোম্পানিটির বুক বিল্ডিংয়ে কাট-অফ প্রাইস হয় ৩০ টাকা। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ২৭ টাকা করে শেয়ার ইস্যু করা হয়। গত ৪ জুন পর্যন্ত যার বাজারদর ছিল ১১ দশমিক ২০ টাকা।
লুব-রেফের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, সিডব্লিউআইপির অর্থ কোনো এক বছরের ব্যয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপের ব্যয়ের সমষ্টি। এ ছাড়া নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে তথ্যগত ঘাটতি রয়েছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
লুব-রেফের সচিব কবির হোসাইন আগামীর সময়কে বলেছেন, আর্থিক হিসাবে দেখানো ২১২ দশমিক ২৬ কোটি টাকা ক্যাপিটাল ওয়ার্ক-ইন-প্রগ্রেস (সিডব্লিউআইপি) কোনো একক বছরের ব্যয় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ব্যয়ের সমষ্টি। বৃহৎ শিল্প প্রকল্পে পরিকল্পনা, ডিজাইন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও যন্ত্রপাতি নির্বাচন প্রাথমিকভাবে সিডব্লিউআইপি হিসেবে স্বীকৃত হয়, যা তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান অবকাঠামো হিসেবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের বিষয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা তথ্যভিত্তিক নয়। একজন শিফট ইঞ্জিনিয়ারকে শুধু পোর্ট এলাকায় নতুন প্রকল্প সাইটে গাইড হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। কোম্পানির স্থায়ী সম্পদ বিবরণী সম্পর্কে তার কোনো পূর্ণ ধারণা নেই। এ ছাড়া হিসাব ও মূসক স্বীকৃতির সময়ভেদের কারণে সৃষ্ট, সমন্বয়যোগ্য বিষয়।
এসব দাবিকে যৌক্তিক মনে করছেন না মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেছেন, শুরুতে পরিকল্পনা করতে কিছু ব্যয় হয়, যেটি দেখা যায় না সত্য। তবে শত শত কোটি টাকার নির্মাণাধীন প্রকল্পের অস্তিত্ব থাকবে না, এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়, যদি না অনিয়ম করা হয়। হিসাবের খাতায় সম্পদ আছে, কিন্তু বাস্তবে নিরীক্ষক পাননি, এর অর্থ অ্যাকাউন্টসে গরমিল আছে।




