প্রতিবেশী দেশকে সুবিধা দিতে ধ্বংসের মুখে চামড়াশিল্প

সংগৃহীত ছবি
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের উদাসীনতা, ভুল নীতি এবং সাভার চামড়াশিল্প নগরীর অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং পরিবেশগত সনদ (এলডব্লিউজি) নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে, যার সরাসরি সুবিধা পেয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ২০১৭ সালে সাভারে জোরপূর্বক ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকে গত ৯ বছরে এই খাতের সক্ষমতা চরমভাবে হ্রাস পেয়েছে।
আজ শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?’ শীর্ষক এক নীতি-আলোচনায় দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এসব মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
আলোচনায় জেনি শুজের চেয়ারম্যান নাসির খান বিগত সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। ‘বিগত সরকার চামড়া খাতকে ইচ্ছা করে ধ্বংস করেছে। ২০১৭ সালে যখন হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্পকে স্থানান্তর করা হয়, ঠিক একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁওয়ে ট্যানারি শিল্প নগরী চালু হয়। এর ফলে একদিকে আমাদের চামড়াশিল্প তার গৌরব হারিয়েছে, অন্যদিকে ভারতে এই শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। অথচ কাঁচা চামড়া প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভারতের চেয়ে আমাদের সুযোগ অনেক বেশি ছিল।’
তিনি আরও জানান, কর-সংক্রান্ত হয়রানি ও জটিল লাইসেন্সিং ব্যবস্থার কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারছে না, যার অন্যতম উদাহরণ বহুজাতিক ব্র্যান্ড ইউনিকলোর বাংলাদেশ ত্যাগ।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান বললেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারকে (সিইটিপি) কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। ওই সময়ে যারা শিল্পমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাদের কেউ চামড়াশিল্প রক্ষায় কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেননি।’
তিনি আরও জানান, হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের মূল কারণ ছিল পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করা, যা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারিয়ে ট্যানারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চরম তারল্য সংকটে ভুগছেন। হাজারীবাগের জায়গা বিক্রির অনুমতি এবং বড় ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব অর্থায়নে ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দিলে এই সংকট কিছুটা কাটত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ সাভারে স্থানান্তরের প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। ‘পরিবেশগত সুবিধা সৃষ্টি না করেই ট্যানারিগুলোকে জোর করে সাভারে পাঠানো হয়েছিল। এর ফলে গত ৯ বছরেও পরিবেশগত সনদের সংকট কাটেনি এবং সাভারে স্থানান্তরের সময়েই ৮০ ভাগ ট্যানারি খেলাপি হয়ে যায়।’
ঋণ সংকটের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘আগে যেখানে কোরবানি ঈদের সময় ট্যানারিগুলো ৪৬০ কোটি টাকা ঋণ পেত, সেখানে এবার মাত্র ৬৫ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে। এছাড়া কাঁচা চামড়া ব্যবস্থাপনার অভাবে এবার কোরবানির ছাগলের চামড়ার প্রায় ৬০ শতাংশই নষ্ট হয়েছে। পাকিস্তানে এই চামড়ার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বললেন, ‘একসময়ের সম্ভাবনাময় খাতটি এখন ম্লান হয়ে যাচ্ছে।’ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম) প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, নতুন পরিবেশগত মান পূরণে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক ও সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দেন।
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান জানান, হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করা। কিন্তু দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে আজ বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী—উভয় নদীই দূষণের শিকার।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমাদের একমাত্রিক সৎ উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সব সময় ভালো ফল বয়ে আনবে—এমনটি নাও হতে পারে। পরিবেশ, অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের পারস্পরিক সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়েই আমাদের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে।’
নীতি-আলোচনায় বক্তারা চামড়াশিল্পের গতি পুনরুদ্ধার করতে ফ্রিজিং ওয়ারহাউজ নির্মাণ, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং কাঁচা চামড়া মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালীকরণের দাবি জানান।




