বাগেরহাটের লবণাক্ততার লড়াইয়ে যেভাবে পাশে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘অপরাজেয় দেশ’

সংগৃহীত ছবি
বাগেরহাট— যেখানে সুন্দরবন এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। জোয়ার-ভাটার এই নিচু ভূখণ্ডে ক্রমেই বাড়ছে লবণাক্ততা। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বারবার বদলে দিয়েছে এখানকার কৃষির চিত্র। লবণ মিশ্রিত মাটি, বিশুদ্ধ পানির সংকট আর জলবায়ুর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেই প্রতিটি মৌসুম পার করেন এই অঞ্চলের কৃষকরা। এখানে এক ফোঁটা পানি, এক ইঞ্চি জমি, আর একটি সঠিক সিদ্ধান্তই টিকে থাকা বা না থাকার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারত্বে ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক এই অঞ্চলে চালু করে ‘অপরাজেয় দেশ’ কর্মসূচি। এটি জলবায়ু সহনশীলতা, পরিবেশগত টেকসই এবং জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যাংকটির পরিচালিত একটি সমন্বিত উদ্যোগ। বাগেরহাটের শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল— এই চারটি উপজেলায় পরিচালিত এ উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। পানি, কৃষি ও পরামর্শসেবাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্র্যাক ব্যাংক ‘অপরাজেয় দেশ’-এর কার্যক্রম।
পানিই জীবন
লবণাক্ততার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট এখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘অপরাজেয় দেশ’ স্থাপন করেছে ১৫টি কমিউনিটিভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং ১৮০টি গৃহভিত্তিক ইউনিট। এ বছর জুনের মধ্যে এগুলো পুরোপুরি কার্যকর হবে। হলুদ রঙের এই ট্যাংকগুলো শুধু পানিই জমায় না; বাঁচায় নারীদের সময়, কমায় পানিবাহিত রোগ, আর বাড়ায় উৎপাদনশীলতা। কমিউনিটির সদস্যরাই এগুলোর ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি করছেন, যার ফলে নিশ্চিত হচ্ছে স্থায়িত্ব।
কৃষিকাজে সম্ভাবনার ক্ষেত্র
লবণাক্ত বা অনাবাদি জমিকে উৎপাদনশীল করে তুলছে এই কর্মসূচির পরিবেশবান্ধব কৃষি উদ্যোগ। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কৃষক পেয়েছেন জলবায়ু সহনশীল বীজ, জৈব সার ও বায়োপেস্টিসাইড। ৩০টি উচ্চমূল্যের প্রদর্শনী প্লটে দেখানো হচ্ছে অভিযোজনযোগ্য কৃষির বাস্তব প্রয়োগ। সূর্যমুখী, সরিষা, ভুট্টা, ডাইক সবজি ও বাড়ির আঙিনার ফসল— সবই চাষ হচ্ছে কম্পোস্ট, ফেরোমন ট্র্যাপ ও ইয়েলো স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার করে। ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠছে নতুন কৃষি বাস্তবতা। তিনটি কমিউনিটি সাইটে বসানো সৌরচালিত সেচপাম্প কমিয়েছে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা, উৎপাদন ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ।
ক্ষমতায়নের গল্প
এই কর্মসূচির সাফল্য বোঝা যায় মানুষের জীবনে আসা ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে। শরণখোলার ৩৩ বছর বয়সী গৃহিণী সুমি বেগম, যিনি আগে কখনো চাষাবাদ করেননি, নিজের ৫ শতাংশ জমিকে রূপ দিয়েছেন সবজির বাগানে। প্রথম মৌসুমেই আয় করেছেন প্রায় ১৫ হাজার টাকা। এখন তিনি জমি ও ফসল দুটিই বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন।
মোরেলগঞ্জের ৪৫ বছর বয়সী রেণুকা রানী মিস্ত্রি ছিলেন একসময়ের প্রশিক্ষিত ধাত্রী। তিনি এক মৌসুমেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করেছেন মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ব্রকলি, স্কোয়াশ, বিটসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করে। এখন তিনি জলবায়ু সহনশীল কৃষি নিয়ে অন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এভাবে পরিবর্তনের সুবাতাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
জ্ঞানই শক্তি
‘অপরাজেয় দেশ’ উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক’, যা স্থায়ী কেন্দ্রের পাশাপাশি মোবাইল সেবার মাধ্যমেও কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়। ৪ হাজারের বেশি কৃষক এখানে পাচ্ছেন ফসলের রোগবালাই, মাটির যত্ন ও পোকামাকড় দমন সম্পর্কে তাৎক্ষণিক পরামর্শ। পাশাপাশি কৃষকদের মোবাইল ফোনে পাঠানো হচ্ছে আবহাওয়া ও জোয়ার-ভাটার তথ্যভিত্তিক ভয়েস এসএমএস, যাতে তারা সময়মতো চাষাবাদ পরিকল্পনা করতে পারেন। এখানে জ্ঞানকে দেখা হচ্ছে শক্তিশালী অবকাঠামো হিসেবে, যা পানির ট্যাংক কিংবা উন্নত বীজের মতোই সমানভাবে জরুরি।
রামপালের ক্ষুদ্র কৃষক কাজী জালালউদ্দিন ‘অ্যাডাপটেশন ক্লিনিক’-এর পরামর্শ নিয়ে সমন্বিত পোকা দমন ও মাটির যত্নের কৌশল প্রয়োগ করে ভুট্টার ফলন বাড়িয়েছেন, কমিয়েছেন রাসায়নিকের ব্যবহার।
বিস্তার ও স্থায়িত্ব
কমিউনিটির সদস্যরাই পানি ব্যবস্থাপনা, ফসল পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার দায়িত্ব নিচ্ছেন, যার ফলে নিশ্চিত হচ্ছে স্থানীয় সংযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব। পাশাপাশি ‘আমার বন’ অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি উদ্যোগের আওতায় ৪৫টি কমিউনিটি প্লট ও ৩০টি হোমস্টেড প্লটে গাছ লাগানো হয়েছে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয়কেই শক্তিশালী করছে।
সম্ভাবনার আগামী
ব্র্যাক ব্যাংকের ‘অপরাজেয় দেশ’ উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু অভিযোজন কোনো কল্পনাতীত বিষয় নয়; বরং এটি বাস্তব এবং পরিমাপ ও পুনরাবৃত্তিযোগ্য। প্রতিটি পানির ট্যাংক, প্রতিটি সহনশীল বীজ এবং প্রত্যেক প্রশিক্ষিত কৃষক— সবই গড়ে তুলছেন টিকে থাকার ভিত্তি। শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, মোংলা ও রামপালে আজ প্রায় ৪৬ হাজার মানুষের জীবনে তার প্রমাণ মিলছে।
খুলনা ও বাগেরহাটের মতো লবণাক্ত উপকূলে প্রতি ফোঁটা পানি ও প্রতি ইঞ্চি মাটি গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রতিটি সক্ষম মানুষের গল্পই হয়ে উঠছে সম্ভাবনার নতুন আশা, যেখানে জমি ও পানির সঙ্গে মানুষের জ্ঞান ও সক্ষমতা মিলে বদলে দিচ্ছে ভবিষ্যৎ।

