অম্লতায় আক্রান্ত দেশের ৪৬ শতাংশ ফসলি জমি, চুন ও জৈব সারে সমাধানের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

ছবি: আগামীর সময়
বাংলাদেশের প্রায় ৮৫ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর ফসলি জমির মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশই অধিক বা অত্যধিক অম্লতায় আক্রান্ত, যা ফসল উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে মাটির অম্লতা কমাতে চুন ও ডলোমাইটের সঠিক ব্যবহার এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন কৃষি ও মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জৈব পদার্থই মৃত্তিকার ‘আত্মা’। তাই টেকসই কৃষি ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
শনিবার (২০ জুন) রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্রের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত দিনব্যাপী ‘চুন প্রযুক্তি ও জৈব পদার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে অম্ল মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা: মৃত্তিকার আত্মা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেছেন। সেমিনারের আয়োজন করে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের রাজশাহী কার্যালয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির মহাসচিব ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি। সভাপতিত্ব করেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. আফছার আলী। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির অ্যানালাইটিক্যাল সার্ভিসেস উইংয়ের পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. আজিজুর রহমান।
আলোচক হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নূরুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিভাগীয় গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম আমিনুল ইসলাম।
প্রবন্ধে অম্ল মৃত্তিকা সৃষ্টির কারণ, ফসল উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব এবং চুন প্রযুক্তির কার্যকারিতা তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেছেন, ফসল উৎপাদনের জন্য ১৭টি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন। এর মধ্যে কার্বন, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন বায়ু ও পানি থেকে পাওয়া গেলেও বাকি উপাদানগুলো মাটি থেকেই গ্রহণ করতে হয়।
মাটির পিএইচ ৫ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ৩-এর মধ্যে থাকলে এসব পুষ্টি উপাদান সহজলভ্য হয়। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি বর্তমানে অতিমাত্রায় অম্ল হয়ে পড়েছে। ফলে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও মলিবডেনামের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি অ্যালুমিনিয়াম ও আয়রনের বিষাক্ত প্রভাবও বাড়ছে।
সেমিনারে জানানো হয়, দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ ফসলি জমি অধিক বা অত্যধিক অম্লতায় আক্রান্ত। এর ফলে ফসলের শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, ডলোমাইট প্রয়োগের মাত্রা মাটির পিএইচ, জৈব পদার্থের পরিমাণ ও মাটির বুনটের ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে প্রতি শতাংশ জমিতে ৩ থেকে ১০ কেজি ডলোমাইট প্রয়োগ করা যেতে পারে। বেলে মাটিতে তুলনামূলক কম এবং এঁটেল মাটিতে বেশি পরিমাণ ডলোমাইট প্রয়োজন হয়। সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করলে মাটির অম্লতা কমে এবং পুষ্টি উপাদান গ্রহণের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
বক্তারা আরও বলেছেন, মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ কমে গেলে পানি ধারণক্ষমতা, উর্বরতা ও জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়। এ কারণেই জৈব পদার্থকে মৃত্তিকার ‘আত্মা’ বলা হয়। গোবর, কম্পোস্ট, ভার্মিকম্পোস্ট ও সবুজ সার ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির গঠন ও উৎপাদনক্ষমতা উন্নত করা সম্ভব।
তারা বলেছেন, টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে শুধু রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে চুন ও জৈব সার ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তারা।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুস্থ, উর্বর ও প্রাণবন্ত মৃত্তিকা অপরিহার্য। তাই মাটির হারানো স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।




