কবর খুঁড়ে বৃদ্ধের অপেক্ষা

প্রতিদিন সকালে কিংবা বিকালে সেই কবরের পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন ৮০ বছর বয়সী আয়েশা খাতুন। ছবি: আগামীর সময়
ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার বড়বালিয়া পাইকারমনি গ্রামের একচালা টিনের ছোট্ট একটি ঘর। পাশেই কবর। তবে সেটি কোনো মৃত মানুষের নয়; বরং জীবিত এক বৃদ্ধার শেষ আশ্রয়। প্রতিদিন সকালে কিংবা বিকালে সেই কবরের পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন ৮০ বছর বয়সী আয়েশা খাতুন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যান নিজের ঘরে। মৃত্যুর পর যেন কাউকে আর কষ্ট করতে না হয়— এ ভাবনা থেকেই জীবিত থাকতেই নিজের কবর খুঁড়ে রেখেছেন তিনি।
আয়েশা খাতুন ওই গ্রামের মৃত আয়নাল হকের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর শেষ বয়সে ভরসা খুঁজেছিলেন সন্তানদের কাছে। কিছুদিন বড় ছেলের বাড়িতে, পরে ছোট ছেলের সংসারেও থেকেছেন। কিন্তু পারিবারিক অশান্তি আর অবহেলা তাকে কোথাও স্থায়ী হতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় আড়াই শতাংশ জমিতে স্থানীয়দের সহায়তায় ছোট একটি ঘর তুলে একাই বসবাস শুরু করেন।
আয়েশা খাতুনের অভিযোগ, জীবনের সব সঞ্চয় ও সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পর থেকেই যেন তিনি তাদের কাছে হয়ে গেছেন অচেনা। কেউ খোঁজ নেয় না, অসুস্থ হলেও দাঁড়ায় না পাশে। দিন যায় অভাব-অনটনে। টিনের চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির পানি ঘরে পড়ে, বিদ্যুতের সুবিধা নেই, অনেক দিন ঠিকমতো খাবারও জোটে না। এসবের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে আরেকটি ভয়— মৃত্যুর পর তাকে দাফন করবে তো কেউ?
কথা বলতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলেন এই বৃদ্ধা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘মা হয়ে সন্তানদের জন্য যা করার সবই করেছি। এখন বয়স হয়েছে, তাই আর কেউ খোঁজ নেয় না। মনে হয়, মারা গেলে আমার জন্য কেউ কবরও খুঁড়বে না। তাই নিজের কবর নিজেই বানিয়ে রাখলাম।’
বিষয়টি প্রশাসনের নজরেও এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ভূল্লী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) খাইরুল ইসলাম। তিনি প্রকৃতপক্ষে অসহায় হয়ে থাকলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার কথাও বললেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।




