কক্সবাজার
প্রস্তুত ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র, খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম

ছবি: আগামীর সময়
টানা চার দিনের অতি ভারী বর্ষণে কক্সবাজারজুড়ে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার অধিকাংশ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, বিচ্ছিন্ন হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, বন্ধ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব নৌপথ। পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা ও বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের অবিলম্বে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।
আজ বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বর্ষণে জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্তত এক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন দুর্যোগে বিপর্যস্ত।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় হয়েছিল ২৭৭ মিলিমিটার এবং তারও আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৪০ মিলিমিটার। অর্থাৎ টানা তিন দিনে জেলায় মোট ৬৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বললেন, স্বল্প সময়ে এ ধরনের অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগামী কয়েক দিনও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা থাকায় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ পানিসিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি শহর ও গ্রামীণ এলাকার খাল-নালা উপচে পড়ায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, জেলার শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিভিন্ন স্থানে ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরের অধিকাংশ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে উত্তাল সাগরের কারণে টানা ছয় দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিতে রয়েছে পাহাড়ঘেঁষা হাজারো ঘর।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত শুকনো খাবারের চাহিদাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে কন্ট্রোল রুমের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে এবং সব উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।





