ছয় নদ-নদী ঘিরেই সম্ভাবনার রংপুর, দরকার শুধু যত্ন

ছয় নদী রক্ষায় বদলে যেতে পারে রংপুরের ভবিষ্যৎ
যে রংপুর শহর একসময় পরিচিত ছিল নদীঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য, সেই শহরের নদীগুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে অবহেলা, দখল ও দূষণে। বিশেষ করে ইছামতি নদী যার তীরে গড়ে উঠেছিল আদি রংপুর। তার নামও এখন অনেকের কাছে হয়ে পড়ছে অপরিচিত।
রংপুর নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত ইছামতিসহ ঘাঘট নদ, শ্যামাসুন্দরী, বুড়াইল নদী, খোকসা ঘাঘট ও আলাইকুমারী নদী। এই ছয়টি নদ-নদী কথা ছিল রংপুরকে আদর্শ নগরীতে রূপ দেওয়ার।
কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এগুলো এখন নগরবাসীর জন্য কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোগান্তির।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন স্থানে নদীগুলোর নেই স্বাভাবিক প্রবাহ, দখল ও দূষণে অনেক জায়গায় হয়ে গেছে নদীর অস্তিত্বই বিলীন। সাতমাথা এলাকায় খোকসা ঘাঘট পরিণত হয়েছে এখন প্রায় খালে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এটি ছিল খরস্রোতা নদী, যার ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য।
অন্যদিকে মাহিগঞ্জ এলাকায় ইছামতি নদী এখন দখল ও ভরাটে প্রায় নিশ্চিহ্ন। নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠেছে বসতি, তাদের অনেকে নদীর নাম পর্যন্ত জানেন না। অথচ এই নদীর তীরেই একসময় গড়ে ওঠেছিল ঐতিহাসিক বন্দর নগরী মাহিগঞ্জ, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে ভিড়ত বড় বড় জাহাজ।
ইতিহাস বলছে, ১৮৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর তিস্তা নদী গতিপথ পরিবর্তন করলে কমে যায় ইছামতির প্রবাহ। এরপর ধীরে ধীরে নদীটি হারাতে শুরু করে তার অস্তিত্ব। বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকাতেও নেই এই নদীর নাম।
নগরীর প্রাণকেন্দ্রে থাকা শ্যামাসুন্দরী নদীর অবস্থাও একই রকম। ১৭০ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত হলেও উচ্ছেদ কার্যক্রম আটকে রয়েছে আইনি জটিলতায়। ফলে নদীটি এখন আশীর্বাদের বদলে পরিণত হয়েছে অভিশাপে।
শুধু এই কয়েকটি নদী নয়, পুরো জেলাজুড়েই নদীগুলোর অবস্থা শোচনীয়। তিস্তা নদী, করতোয়া নদীসহ বড় নদীগুলোরও স্বাস্থ্য ভালো নয়। ছোট-বড় মিলিয়ে ৩৩টি নদীর একটির অবস্থাও সন্তোষজনক নয়।
নদী বিষয়ক গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, ইছামতি শুধু একটি নদী নয়, এটি রংপুরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অংশ। এই নদীসহ নগরের ছয়টি নদীকে কেন্দ্র করে রংপুরকে একটি পরিকল্পিত ও নান্দনিক নগরীতে রূপ দেওয়া সম্ভব।
তিনি সতর্ক করে বললেন, এখনই যদি দখলমুক্ত করে নদীগুলোর ফিরিয়ে আনা না যায় স্বাভাবিক প্রবাহ, তবে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ বিপর্যয় এবং মারাত্মক প্রভাব পড়বে কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এই নদীগুলোই হতে পারে রংপুরের সৌন্দর্য ও পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার।



