শিল্পায়নের পথে মেঘনা

সংগৃহীত ছবি
একসময় নানা দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মেঘনা এখন বদলাচ্ছে। নদী, চর আর সবুজ প্রকৃতির এই জনপদে ধীরে ধীরে বাড়ছে যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এরই মধ্যে ঢাকার অদূরে উপজেলার লুটেরচর এলাকায় মেঘনা গ্রুপের কুমিল্লা ইকোনমিক জোন ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। কারখানাগুলো চালু হলে তৈরি হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাড়বে শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজের জন্য আসবেন, তাদের অনেকে পরিবার নিয়ে মেঘনায় বসবাসও করবেন। শিল্পায়নের এই অগ্রযাত্রায় মেঘনার অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও মেঘনায় শিশুদের জন্য এখনো তৈরি হয়নি একটি মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্র। ঈদ কিংবা বিভিন্ন ছুটিতে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে বাড়িতে ফিরলেও সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পান না অনেকে। স্থানীয় শিশুদেরও খেলাধুলা ও অবসর কাটানোর সুযোগ সীমিত। ফলে পড়াশোনার বাইরে প্রকৃতির কাছে গিয়ে সময় কাটানো কিংবা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই।
শিল্পাঞ্চল চালু হলে এই প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কুমিল্লা ইকোনমিক জোনে কাজ করতে আসা শ্রমিক-কর্মচারীদের অনেকেই পরিবার নিয়ে মেঘনায় বসবাস করবেন। তাদের সন্তানরাও এখানকারই শিশু হয়ে উঠবে। তাই এখন একটি পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে তা শুধু বর্তমান বাসিন্দাদের জন্য নয়, শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে ভবিষ্যতে গড়ে ওঠা নতুন জনবসতির মানুষেরও প্রয়োজন মেটাবে। একটি কর্মসংস্থানমুখী এলাকার পাশাপাশি পরিবার নিয়ে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলা এবং উন্মুক্ত পরিবেশের গুরুত্ব রয়েছে। সেই সুযোগ তৈরিতে উপজেলার সরকারি খাস জমি কাজে লাগানো যেতে পারে। নদীর তীর ঘেঁষে শিশু পার্ক, খেলার মাঠ, হাঁটার পথ, সবুজ বাগান, বসার জায়গা ও পারিবারিক অবকাশের ব্যবস্থা করা হলে তৈরি হতে পারে একটি সুন্দর বিনোদনকেন্দ্র। বিশেষ করে চালিভাঙ্গার নলচর এবং চন্দনপুরসহ শাতানী এলাকার মেঘনা নদীর তীরবর্তী সরকারি খাস জমিগুলো এ ধরনের উদ্যোগের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।
এমন একটি কেন্দ্র গড়ে উঠলে পরন্ত বিকেলে সন্তানদের নিয়ে বের হওয়ার সুযোগ পাবেন অভিভাবকেরা। শিশুরা খেলাধুলা করবে, পরিবারের সদস্যরা নদীর পাড়ে বসে সময় কাটাবেন। ছুটির দিনে পুরো পরিবার নিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটানোর পাশাপাশি মেঘনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগও তৈরি হবে। শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে মানুষের সংখ্যা বাড়লে এই কেন্দ্র স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সেখানে কর্মরত মানুষ ও তাঁদের পরিবারের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
মেঘনা উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও মানিকারচর সাহেরা লতিফ মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সাহিত্যপ্রেমী আবুল কালাম ভূঁইয়া বললেন, আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতের কর্ণধার। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের সুযোগ থাকা জরুরি। মেঘনার মতো একটি সম্ভাবনাময় উপজেলায় শিশুদের জন্য আধুনিক একটি বিনোদনকেন্দ্র করা দরকার। এতে শিশুরা নির্মল পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে মোবাইল আসক্তি থেকেও তাদের দূরে রাখা সম্ভব হবে।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্বাস উদ্দিন বলেন, আমরা একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত বিনোদনের ব্যবস্থা থাকাও প্রয়োজন। মেঘনায় একটি শিশু বিনোদনকেন্দ্র হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে। এটি উপজেলার জন্যও একটি গর্বের স্থাপনা হতে পারে।
মেঘনা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. রমিজ উদ্দিন লন্ডনী বলেন, এটি জনস্বার্থের বিষয়। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে এমন উদ্যোগে সহযোগিতা করা উচিত। নদীর পাড়ের সরকারি খাস জমিতে একটি আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র হলে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বাইরের লোকজনও এখানে আসবেন। এতে মেঘনার পরিচিতি বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির মতে, মেঘনার উন্নয়ন এখন আর শুধু সম্ভাবনার কথা নয়। কুমিল্লা ইকোনমিক জোনকে ঘিরে শিল্পায়নের যে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, তার সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার প্রয়োজনগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
তাদের মতে, উন্নয়ন শুধু কারখানা, রাস্তা, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ ও বিনোদনের সুযোগ তৈরি করাও একটি জনপদের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ।
মেঘনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী আক্তার বলেন, শিশুদের জন্য একটি ভালো বিনোদনকেন্দ্র থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। উপজেলায় সরকারি জায়গা থাকলে এবং সেখানে এমন একটি কেন্দ্র করার সুযোগ থাকলে বিষয়টি আমরা বিবেচনা করে দেখব। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
মেঘনা এখন শিল্পায়নের পথে। কুমিল্লা ইকোনমিক জোনকে ঘিরে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি বদলাবে মানুষের জীবনযাত্রাও। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে যদি নদীর পাড়ে শিশুদের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ বিনোদনকেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত হবে। শিল্পের ব্যস্ততার পাশাপাশি নদীর ধারে শিশুদের হাসি, খেলাধুলা আর পরিবারের আনন্দ করার মতো এমন একটি মেঘনাই এখন দেখতে চান স্থানীয়রা।




