ফসলি জমি গিলে খাচ্ছে পুকুর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

ছবি: আগামীর সময়
কাগজে-কলমে কৃষিজমি রক্ষার কঠোর নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে। উপজেলার উর্বর ফসলি জমি ভেকু মেশিনে বদলে যাচ্ছে পুকুরে।
মাছ চাষের লাভের আশায় পরিকল্পনাহীন খননে কমছে আবাদি জমি। একই সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে পানি ব্যবস্থাপনা, আর ধীরে ধীরে সংকটে পড়ছেন কৃষক।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও কৃষিজমির প্রকৃতি বদলানো নিষিদ্ধ। তবে ভেদরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নির্দেশনা উপেক্ষা করে তিন ফসলি জমিতে অবাধে পুকুর খননের অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন আবাদি জমির পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আশপাশের কৃষকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাছ চাষে বেশি লাভের আশায় এক শ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি কৃষকদের প্রলোভন, চাপ ও হুমকি দিয়ে বাধ্য করছেন জমি দিতে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মিলছে না বলে দাবি করেছেন তারা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুকুর খননের কারণে ভেদরগঞ্জে প্রতিবছর প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। একসময় যে জমিতে ধান, পাটসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হতো, সেখানে এখন গড়ে উঠছে জলাশয়। অপরিকল্পিত খননের কারণে কোথাও পানি জমে ফসল নষ্ট হচ্ছে, আবার কোথাও পানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে চাষাবাদ।
কৃষকেরা জানিয়েছেন, আগে যে জমিতে বছরে দুই মৌসুমে ধান উৎপাদন হতো, এখন সেখানে উৎপাদন কমে গেছে। পানিব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ায় আরও কঠিন হয়ে উঠছে কৃষিকাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার মহিষার ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের রতন ছৈয়ালের বাড়ির পাশে তিন ফসলি কৃষিজমিতে একসঙ্গে চারটি এক্সকাভেটর দিয়ে কাজ চলছে পুকুর খননের।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া, একই ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিমের বিল, মহিষকান্দি গ্রামের নামারচর, আরশিনগর ইউনিয়নের নান্টু মালত বাজার, চরভাগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাজার, স্টেশন বাজার ও মমিন আলী মোল্লার বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমিতে পুকুর খননের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মহিষার ইউনিয়নের বাড়ৌই জঙ্গল গ্রামের কৃষক লিটন মিয়া বলেছেন, ‘কৃষিজমিতে পুকুর খনন করে তৈরি করা হচ্ছে মাছের ঘের। জমি দিতে না চাইলে দেওয়া হচ্ছে চাপ ও হুমকি। প্রশাসনকে জানালেও কোনো সমাধান পাচ্ছি না।’
একই ইউনিয়নের কৃষক আবু বক্কর বলেছেন, ‘আমার জমির পাশে জোর করে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ফসলি জমি হারিয়ে যাবে। কৃষিজমি রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
চরভাগা ইউনিয়নের কৃষক মতিন মিয়ার ভাষ্য, ‘অপরিকল্পিত পুকুর খননের কারণে জমির পানি ব্যবস্থাপনা নষ্ট হয়ে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। নিষেধ করলেও কেউ শুনছে না, বরং হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হাফিজুল হক জানিয়েছেন, ফসলি জমিতে পুকুর খনন সম্পূর্ণ বেআইনি। জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কাজ করা যায় না। করলেও তা নিজের জমিতেও সীমিত শর্তে অনুমোদনযোগ্য। জোরপূর্বক পুকুর খনন ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনায় অভিযোগ পেলেই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





