জ্যোতি সিনহার নৃত্যাভিনয়ে মঞ্চে ফুটে উঠল দেবী দুর্গার মহাশক্তি

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গারূপে নৃত্যাভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন মঞ্চাভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী জ্যোতি সিনহা। ছবি: আগামীর সময়
নৃত্য, সংগীত ও অভিনয়ের শৈল্পিক সমন্বয়ে দেবী দুর্গার মহাশক্তি ও নারীর অন্তর্নিহিত শক্তির বহুমাত্রিক রূপ ফুটে উঠেছে ‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ নৃত্যনাট্যে। এতে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গারূপে নৃত্যাভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন মঞ্চাভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী জ্যোতি সিনহা।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে মঞ্চস্থ নৃত্যনাট্যটি পৌরাণিক আখ্যানকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে দর্শকদের সামনে দেবীশক্তির এক ভিন্নতর রূপ তুলে ধরেছে।
গতকাল সোমবার রাত নয়টায় শ্রীমঙ্গল শহরের জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে দেবাঙ্গন ছাত্র পরিষদের আয়োজনে আগমনী ড্যান্স প্রোডাকশন হাউজের পরিবেশনায় নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ হয়। বর্ণিল আলোকসজ্জা, নৃত্যাভিনয় ও সংগীতের সমন্বয়ে সাজানো এ আয়োজন দেখতে মিলনায়তনে দর্শকদের ভিড় জমে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বর্ণিল সাজে সজ্জিত শিশুদের পরিবেশনায় ‘দুর্গা এলো’ গানের মধ্য দিয়ে আয়োজনের সূচনা হয়। এরপর একে একে মঞ্চে ফুটে ওঠে পৌরাণিক আখ্যান, দেবী দুর্গার নানা রূপ এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের বার্তা। নৃত্যনাট্যের পাশাপাশি ‘মন্ত্রেতে মোহনায়’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন ইশান মজুমদার।
‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’ একটি সংস্কৃত শব্দবন্ধ। এর অর্থ, যিনি সকল জীবের মধ্যে বিরাজমান। দেবীমাহাত্ম্যের ভাবধারায় দেবী দুর্গাকে সমগ্র সৃষ্টি, প্রাণ ও চেতনার অন্তর্নিহিত শক্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়। নৃত্যনাট্যটিতে দেবীকে কেবল পূজার প্রতিমা হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতি, প্রাণ, মানুষের মমতা, সাহস ও সৃজনশীলতার মধ্যেও বিরাজমান শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নৃত্যনাট্যটিতে মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার ভূমিকায় নৃত্যাভিনয় করেন জ্যোতি সিনহা। চরিত্রটি নিয়ে নিজের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, যুগে যুগে পৃথিবীর নারীদের বঞ্চনা, অবহেলা, অত্যাচার ও নিগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী রূপ হিসেবে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা। দেবীর প্রতি নিজের বিশেষ আকর্ষণের কথা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘বরাবরই তার প্রতি আমার এক ধরনের মোহ আছে। তাই এমন একটি চরিত্রে কাজ করতে বরাবর আগ্রহ বোধ করি।’
জ্যোতি সিনহা জানান, বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) দুই বার দুর্গার ভূমিকায় নৃত্যাভিনয় করেছেন তিনি। এ ছাড়া প্রতিবছর দুর্গাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কাজ করেন। এবার মৌলভীবাজারের তরুণ নৃত্যশিল্পী প্রাপ্ত প্রীতমের আমন্ত্রণে নৃত্যনাট্যটিতে অংশ নিতে পেরে তার ভীষণ ভালো লাগছে।
নৃত্যনাট্যটির ভাবনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন প্রাপ্ত প্রীতম। এতে তিনি মহাদেবের ভূমিকায় নৃত্য পরিবেশন করেন। জ্যোতি সিনহার মতো অভিজ্ঞ শিল্পীর সঙ্গে কাজের সুযোগকে বিশেষ প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।
প্রাপ্ত প্রীতম বলেছেন, ‘জ্যোতি সিনহা দেশের একজন গুণী নাট্যশিল্পী, মণিপুরী থিয়েটারের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তিনি মণিপুরী নৃত্য নিয়ে কাজ করেন। তার মতো একজন অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান শিল্পীকে আমার কাজের অংশ হিসেবে পাওয়া সত্যিই ভীষণ আনন্দের, গর্বের এবং আবেগের।’
এবারের আয়োজনে অংশ নেন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন শিল্পী। মহিষাসুরের ভূমিকায় ছিলেন অভিজিৎ কুণ্ডু এবং কালীরূপে ছিলেন দেবযানী রায়। এ ছাড়া নৃত্যনাট্যের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় ও নৃত্য পরিবেশন করেন জাতীয়ভাবে পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুশিল্পী অনশ্রী, ঈশিতা বাহাদুর, বিততী বিদ্যা, নিশিতা রাত্রি, কাহিনী দেব ও তুলনা তুষ্টিসহ অনেকে।
আয়োজকরা জানান, দীর্ঘ নয় বছর ধরে নিজস্ব অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে পৌরাণিক আখ্যানের পুনর্নির্মাণে কাজ করছে আগমনী ড্যান্স প্রোডাকশন হাউজ। প্রতিবছর মৌলভীবাজারে দেবীপক্ষ সংগঠনের আয়োজনে মহালয়া উপলক্ষে দলটির প্রযোজনায় দক্ষিণ এশিয়ার পুরাণ ও নারীশক্তির নানা দিক তুলে ধরা হয়। এবারের প্রযোজনা ‘সর্বভূতেষু সংস্থিতা’য় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে দেবী তথা নারীশক্তির সর্বব্যাপী সত্তা।
নৃত্যনাট্যটির ভাবনায় মানুষের মমতা, সাহস, জ্ঞান, দয়া, সৃজনশীলতা ও কল্যাণবোধের মধ্যেও দেবীশক্তির প্রকাশ খোঁজা হয়েছে। পৌরাণিক আখ্যানকে সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা তুলে ধরেছেন নারীশক্তির বহুমাত্রিক রূপ। নৃত্য, সংগীত ও অভিনয়ের সম্মিলিত পরিবেশনা শারদীয় উৎসবের আবহে দর্শকদের পরিচিত পৌরাণিক কাহিনিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয়।




