চা শিল্পের সাফল্যের আড়ালে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের সংকট

ছবি: আগামীর সময়
ঝড়-বৃষ্টি, রোদ আর তুফানের মধ্যে প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করেও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার আক্ষেপ তুলে ধরেছেন চা শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, বর্তমান মজুরিতে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। অনেক বাগানে নারী শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধাও নেই।
শনিবার (২০ জুন) মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চা শ্রমিকরা তাদের জীবনের এমন বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ চা বোর্ডের আয়োজনে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে শ্রীমঙ্গলের মাজদিহি চা বাগানের নারী শ্রমিক সনতকি রায় বলেছেন, ‘আমরা ঝড়-বৃষ্টি, রোদ ও তুফানের মধ্যে কাজ করি। কিন্তু যে মজুরি পাই, তা দিয়ে সন্তানদের ভালো খাবার দিতে পারি না। অনেক বাগানে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। একটি ঘরে ছয়-সাতজন মানুষ থাকতে হয়।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বর্তমান মজুরিতে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন। অস্থায়ী শ্রমিকরা রেশন সুবিধা পান না। শ্রমিক পরিবারের সদস্যসংখ্যার তুলনায় আবাসন ব্যবস্থাও অপ্রতুল।’
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নেপচুন চা বাগানের শ্রমিক ও এ বছর শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী হিসেবে জাতীয় চা পুরস্কার পাওয়া জেসমিন আক্তারও শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পুরস্কার পাওয়া আনন্দের হলেও বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন। শ্রমিকদের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, আবাসন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, এনডিসি। স্বাগত বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।
আলোচনা সভায় বক্তারা দেশের চা শিল্পের সাফল্য, সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তারা বলেন, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চা উৎপাদন, গবেষণা, উন্নত প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রধান অতিথি মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের চা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাংলাদেশের চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে শিল্পের উন্নয়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
অনুষ্ঠানে ‘জাতীয় চা পুরস্কার-২০২৬’ প্রদান করা হয়। চা শিল্পে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটটি ক্যাটাগরি ও একটি বিশেষ ক্যাটাগরিতে মোট নয়টি পুরস্কার দেওয়া হয়।
একরপ্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান হিসেবে কমলগঞ্জের শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান, সর্বোচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগান হিসেবে হবিগঞ্জের মধুপুর চা বাগান পুরস্কার পায়। শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারক হিসেবে দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়তন চা উৎপাদক হিসেবে পঞ্চগড়ের মো. মতিয়ার রহমান পুরস্কার পান।
শ্রমিক কল্যাণে শ্রেষ্ঠ চা বাগান নির্বাচিত হয় শ্রীমঙ্গলের মির্জাপুর চা বাগান। বৈচিত্র্যময় চা পণ্য বাজারজাতকরণ ও মানসম্পন্ন চা মোড়ক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায় কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড। শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী হিসেবে নেপচুন চা বাগানের শ্রমিক জেসমিন আক্তার এবং বিশেষ ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ বটলিফ চা কারখানা হিসেবে পঞ্চগড়ের সুপ্রিম টি লিমিটেড পুরস্কার লাভ করে।
চা শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, মজুরি বাড়লেও বর্তমান বাজারদরে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন। অধিকাংশ চা বাগানে মানসম্মত শিক্ষা, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসন সুবিধার সংকট এখনো শ্রমিকদের বড় সমস্যা হয়ে রয়েছে।




