শোরুমে লাখ টাকার জামদানি, তাঁতির ঘরে অভাব

রূপগঞ্জের একটি কারখানায় জামদানি শাড়ি তৈরি করছেন নারী শ্রমিকরা—সংগৃহীত ছবি
মসলিনের উত্তরসূরি এবং বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক জামদানি। সূক্ষ্ম নকশা ও নিখুঁত বুননের জন্য বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত, এমনকি ২০১৩ সালে ইউনেসকোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ।
এখানকার তারাব, রূপসী, নোয়াপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় হাজারো তাঁতি পরিবার জামদানি বুননের সঙ্গে জড়িত থাকলেও, বর্তমানে চরম দুর্দিন পার করছেন তারা। শতাব্দীর এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এখন প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হচ্ছে কারিগরদের।
কালের বিবর্তনে জামদানির মূল্য ও ব্যবসায়ীদের লাভ বহুগুণ বাড়লেও, ভাগ্য বদলায়নি প্রকৃত কারিগরদের। সুতা ও রঙের দাম বৃদ্ধি, দক্ষ শ্রমিকের অভাব এবং ভারতীয় নকল বা মেশিনে তৈরি জামদানিতে দেশীয় বাজার সয়লাব হওয়ায় আসল জামদানির কদর হুমকির মুখে।
জামদানির কারিগর নয়ন মিয়া জানালেন, রূপগঞ্জে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ টাকার বেশি দামের শাড়ি তৈরি হয়। একটি উন্নতমানের শাড়ি বুনতে ১৫ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু এর বিনিময়ে তাঁতিরা মজুরি পান মাত্র ১০-২০ হাজার টাকা। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ায় অনেকেই পেশা ছাড়ছেন। ফলে গত কয়েক বছরে রূপগঞ্জে তাঁতির সংখ্যা ৫ হাজার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ হাজারে।
নোয়াপাড়ার সোনালি জামদানি কুটিরের মালিক আবু তাহের বললেন, ‘আমাদের এখানে উৎপাদিত জামদানির দাম একেক রকম। ৩ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ বা এর বেশি টাকার শাড়ি এখানে তৈরি হয়। এসব শাড়ি বড় বড় শপিংমলে গেলে হয়ে যায় দ্বিগুণ-তিন গুণ দাম। তবে ভারতীয় নকল জামদানির দাম কম হওয়ায় বাজার হারাচ্ছে দেশীয় জামদানি।
সরেজমিনে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ঘেঁষা রূপগঞ্জের জামদানিপল্লী তাঁত বোনার খটখট শব্দে মুখরিত। পল্লীর প্রায় প্রতিটি ঘরেই চলছে শাড়ি তৈরির কাজ। তবে পল্লীতে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা ও ঘিঞ্জি পরিবেশ। এমন পরিবেশ দেখে হতাশা প্রকাশ করেন সেখানে আসা ক্রেতারা।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪৬১টি লে আউট প্ল্যান ও বাস্তবতা নিয়ে বিসিক শিল্পনগরীতে ১৫০০ জামদানি তাঁতি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা বসবাস করেন নোয়াপাড়ায়। বিধিমতে, প্রতিিট প্লটে তাঁতকল, শোরুম থাকার শর্ত থাকলেও বাস্তবে বহু প্লটে নেই এসবের উপস্থিতি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি এ প্রকল্পে ৫৪ জনের কেউ-ই তাঁতি নন। অথচ তাদের দখলে আছে প্লট, করেছেন পাকা বাড়ি।
এক জামদানি তাঁতি আগামীর সময়কে বললেন, প্রকৃত জামদানিসংশ্লিষ্টরা অনেকেই এখানে ভাড়ায় থাকেন। ঘর ও প্লটের কাগজে মালিকানা নেতাদের নামে। এক ব্যক্তির নামেই তিন থেকে পাঁচটি প্লট, যা থেকে অবৈধ উপায়ে ভাড়া নিচ্ছেন তারা।
প্লট দখলের অভিযোগের বিষয়ে নোয়াপাড়া বিসিক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেছেন, ৫৪ জনের মতো ভুয়া তাঁতির তালিকা পেয়েছি। যাদের অনেকেই জামদানিসংশ্লিষ্ট নন। শিগগির তাদের বিসিক এলাকার প্রপার্টিস্বত্ব বাতিল করা হবে।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রভাবও পড়েছে জামদানির বাজারে। তবে পল্লীর জামদানি বুটিক হাউজের মালিক কবির হোসেনের ভাষ্য, রাজনৈতিক কারণে গত কয়েক বছর বাজার খারাপ থাকলেও এ বছর থেকে তা আবার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। বাজারে জামদানির বিক্রিও বেড়েছে।
নানা সংকটের মধ্যেও নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে অনলাইন বাজার। সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি কারিগর ও উদ্যোক্তারা ই-কমার্স এবং ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জামদানি পৌঁছে দিচ্ছেন। ঈদ ও পূজার মতো উৎসবকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ৫০-৮০ কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। এ ছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার জামদানি রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।






