চলচ্চিত্রের স্বপ্নভঙ্গ থেকে সফল উদ্যোক্তা, রংপুরের মিতুলের ‘আহ্লাদ’ ছড়াচ্ছে আলো

ছবি: আগামীর সময়
বুকে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে রুপালি পর্দার পেছনে পথচলা শুরু করেছিলেন রংপুরের মেয়ে জুয়েনা ফেরদৌস মিতুল। ১৯৯২ সালে ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ব বিভাগে। ১৯৯৪ সালে ২৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী থাকাকালীনই চলচ্চিত্রের কস্টিউম অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদের ‘মুক্তির কথা’, ‘নারীর কথা’, ‘মাটির ময়না’ ও ‘অন্তর্যাত্রা’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন তিনি। যুক্ত ছিলেন ‘গাঁও’ নামের একটি স্বনামধন্য প্রোডাকশন হাউজেও। কিন্তু জীবন সব সময় এক লাইনে চলে না। ২০১৭ সালে পারিবারিক কারণে রাজধানী ঢাকা ছেড়ে ফিরে আসতে হয় জন্মভিটা রংপুরে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এক লড়াকু নারীর জীবনের নতুন এক অধ্যায়।
রংপুরে ফিরে দুই সন্তান নিয়ে শুরুতে বেশ হোঁচট খেতে হয়েছিল মিতুলকে। টিকে থাকার তাগিদে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি নেন। কিন্তু করোনা মহামারির থাবায় সেই চাকরিটাও চলে যায়। আবারও জীবনে ছন্দপতন, চারদিকে শুধু দিশেহারা অন্ধকার। ঠিক তখনই, একদিন সুইডেন প্রবাসী বন্ধু ফাহিমের একটি ফোন কল মিতুলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বন্ধুর কিছু পরিবেশবান্ধব ব্যাগ দরকার ছিল। বন্ধুর জন্য সেই ব্যাগের উপাদান খুঁজতে গিয়েই মিতুল প্রথম আবিষ্কার করেন পাটের বহুমুখী সম্ভাবনা।
নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেন। শুরুতে নিজের করা ডিজাইনে অন্য কারখানা থেকে ব্যাগ তৈরি করিয়ে নিতেন। কিন্তু পণ্যের গুণগত মান ও নিজের মনের মতো নিখুঁত কাজ না পাওয়ায় ২০২১ সালে নিজেই রংপুরে প্রতিষ্ঠা করেন কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘আহ্লাদ’। রংপুর নগরীর কেরানীপাড়ায় মাত্র একটি সেলাই মেশিন আর একজন কর্মী নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘আহ্লাদ’-এর পথচলা। এরপর আর মিতুলকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আজ ‘আহ্লাদ’ ফ্যাশনে গেলেই দেখা যায় এক অন্যরকম দৃশ্য। সেখানে কর্মী আর কারিগরদের সাথে কাঁধ মিলিয়ে নিজেই কাজ করছেন উদ্যোক্তা মিতুল। পাট, ক্যানভাস, ডেনিম এবং রিসাইকেলড (পুনর্ব্যবহারযোগ্য) শাড়ির মতো সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে স্কুল ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, অফিস ব্যাগ, গিটার ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, শপিং ব্যাগ, ক্যামেরা ব্যাগ ও লাঞ্চ ব্যাগসহ হরেক রকমের ব্যাগ। শুধু ব্যাগই নয়, এখানে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন খেলনা, শোপিস, ওয়ালমেট, আল্পনা, পাপোশ, শিকা ও দড়ি। এমনকি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উচ্ছিষ্ট টুকরো জিনিসপত্র দিয়েও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন নতুন পণ্য। মিতুলের তৈরি প্রতিটি পণ্যের গায়ে যেন লেপ্টে আছে দেশের লোকজ সংস্কৃতি আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের গল্প।
মিতুলের এই শৈল্পিক ‘আহ্লাদ’ অল্প সময়েই মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। সৌভাগ্যবশত কারখানা শুরুর দিকেই জার্মান কালচারাল সেন্টারের একটি অনুষ্ঠানের জন্য ১৫শ’ ব্যাগের বড় অর্ডার পান তিনি। এরপর একে একে জার্মান অ্যাম্বাসি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ‘দৃক’-এর মতো সংস্থায় ব্যাগ সরবরাহ করেছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ‘আহ্লাদ’-এর তৈরি ব্যাগ এখন নেদারল্যান্ডস, জাপান, আমেরিকা ও লন্ডনে রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া রংপুরের নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন—সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিলেনিয়াম স্টারস স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ব্যাগ সরবরাহ করছে এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে কারখানায় একটি মেশিনের জায়গায় বসেছে ১২টি অত্যাধুনিক মেশিন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি মিতুল বড় একটি সামাজিক পরিবর্তন এনেছেন গ্রামীণ নারীদের জীবনে। বর্তমানে তাঁর কারখানায় নিয়মিত ১৫ জন নারী কাজ করছেন। এর বাইরে রংপুর সদরের দেওডোবা, অযোধ্যাপুর এবং মিঠাপুকুরের সুলতানপুর ও বিনোদপুর—এই চারটি গ্রামের শতাধিক নারীকে নিজ দায়িত্বে প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছেন তিনি।
কারখানায় কর্মরত রিক্তা রানী মোহন্ত, মঞ্জিলা বেগম ও আলেয়া বেগমরা সন্তোষ প্রকাশ করে বললেন, 'আমরা এখানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করছি। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টাকা অর্থাৎ মাসে অন্তত ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়ে আমাদের সংসার খুব ভালোভাবে চলছে।' আবার মিঠাপুকুরের বিনোদপুর সাঁওতালপাড়ার মালতি খুজুর গর্ব করে বলেন, 'আমরা গ্রামের অনেকেই মিতুল আপার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এখন বাড়িতে বসে কাজ করে ওনাকে পৌঁছে দিই। এতে সংসারে বাড়তি আয় হচ্ছে।'
কাজের অনন্য স্বীকৃতিস্বরূপ মিতুল ইতোমধ্যে পিকেএসএফ (পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন) থেকে দুটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া রংপুর সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পেয়েছেন ‘জয়িতা’র সম্মাননা।
নিজের এই অদম্য যাত্রা সম্পর্কে জুয়েনা ফেরদৌস মিতুল জানালেন, 'একটা সৃষ্টি, একটা জার্নি—এটাই আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। আমরা যখন একটা ব্যাগ বহন করি, সেই ব্যাগের সাথে যেন আমাদের দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকেও বহন করতে পারি, সেই চিন্তা থেকেই আমি ডিজাইনগুলো করি।” নিজের কর্মীদের নিয়ে মিতুলের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। তার ভাষ্য, 'আমি স্বপ্ন দেখি, আমার কর্মীরা শুধু কাজের বিনিময়ে টাকা পেয়েই থমকে যাবে না; তারা কাজ শিখে একদিন নিজেরাই একেকজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে।'




