মমেক হাসপাতালে চিকিৎসার আগে দীর্ঘ অপেক্ষার কষ্ট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সকাল ১০টা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারে শত শত মানুষের জটলা। সেই জটলা ভবনের ভেতর পেরিয়ে বাইরের সড়ক পর্যন্ত লম্বা লাইনে গড়িয়েছে। কচ্ছপের গতিতে লাইন এগোচ্ছে টিকিট কাউন্টারের দিকে। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ রোদ ও গরমে মুখের ঘাম মুছছেন, কেউ আবার বারবার সামনের দিকে উঁকি দিয়ে দেখছেন আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
চিকিৎসা পাওয়ার আগে দীর্ঘ অপেক্ষার এ কষ্ট যেন এখানকার রোগীদের নিত্যসঙ্গী। লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বললে সেই অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নগরীর খাগডহর এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন আসগর আলী। এত ভিড় হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। তার ধারণা, টিকিট কাউন্টারে পৌঁছাতেই অন্তত আধা ঘণ্টা লাগবে। তবে টিকিট পেলেই যে ভোগান্তির শেষ, তা নয়। এরপর তাকে দাঁড়াতে হবে চিকিৎসকের কক্ষের সামনের আরেকটি লাইনে।
অর্থাৎ, হাসপাতালের বহির্বিভাগে একজন রোগীর চিকিৎসার পথ শুরুই হচ্ছে একাধিক ধাপের অপেক্ষা দিয়ে। টিকিট কাউন্টার পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেও দেখা যায়, ভিড় কমেনি; বরং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষের সামনে একই চিত্র।
শিশু চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ আয়েশা খাতুন জানালেন, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় ৪০ মিনিট। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা ব্যথা হয়ে গেছে। তবে রোগীর সংখ্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বললেন, ‘রোগী বেশি, ডাক্তারইবা কী করবেন?’
রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসকরাও সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীদের এমন কষ্টের দৃশ্য নতুন নয়। তবে সময়ের সঙ্গে বাড়ছে রোগীর চাপও। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় চার হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে। বর্তমান অবকাঠামো, জনবল ও চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল এ হাসপাতাল। শুধু ময়মনসিংহ নগরী বা জেলার মানুষ নন, আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও রোগীরা আসেন এখানে। জটিল রোগে আক্রান্তরা ভর্তি হয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে নেন চিকিৎসা। শিশু, মেডিসিন, গাইনি, সার্জারিসহ বিভিন্ন বিভাগেও থাকে রোগীর ভিড়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কক্ষে গিয়ে আবার অপেক্ষা করতে হয়। এ দুটি ধাপই রোগীদের ভোগান্তির প্রধান জায়গা। এতে অসুস্থ মানুষের শারীরিক কষ্ট আরও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে শিশু কোলে নিয়ে আসা মায়েদের ভোগান্তি বেশি। বয়স্ক রোগীদের জন্যও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। অসুস্থ শরীর নিয়ে গরম ও ভিড়ের মধ্যে অপেক্ষা করতে করতে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সালাম নামে এক যুবক বললেন, ‘গরমে খুব কষ্ট। মানুষে গিজগিজ করছে। ফ্যানের বাতাসও গরম। শান্তিতে একটু শ্বাসও ফেলা যায় না। ভিড়ের কারণে ডাক্তার দেখাতে অনেক দেরি হয়।’
আরেক রোগী শরীফুজ্জামানের ভাষ্য, লাইনে দাঁড়ানো, ভিড় আর গরমেই তিনি কাহিল হয়ে পড়েছেন। দ্রুত চিকিৎসক দেখিয়ে বাইরে বের হতে পারলেই স্বস্তি পাবেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। ময়মনসিংহ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে রোগী আসছেন এখানে। এমনকি কুড়িগ্রামের রৌমারী, সুনামগঞ্জ এবং গাজীপুরের একাংশ থেকেও আসেন রোগী। এক হাজার শয্যার এ হাসপাতাল এখন রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে সংকটের প্রভাব পড়ছে রোগী ও চিকিৎসক— উভয়ের ওপরই।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাঈন উদ্দিন মনে করেন, ‘রোগীর ভিড়ই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। তবে চিকিৎসা নিতে এসে কেউ ফিরে যায় না।’ নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে সমস্যা কিছুটা কমবে, আশা করছেন তিনি।





