পাথরঘাটায় নেই মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র, ক্ষতিগ্রস্ত ইলিশ উৎপাদন

ছবি: আগামীর সময়
দেশের উপকূলীয় মৎস্য অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বরগুনার পাথরঘাটা। বাংলাদেশ মৎস্য কর্পোরেশনের (বিএফডিসি) অধীনে পরিচালিত দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি মাছ বিক্রয় কেন্দ্র এখানেই অবস্থিত, যেখানে প্রতিদিন কেনাবেচা হয় গভীর সমুদ্র থেকে আহরিত বিপুল পরিমাণ মাছ। বিশেষ করে ইলিশ মাছের উৎপাদন ও বিপণনে পাথরঘাটা দীর্ঘদিন ধরেই রেখে আসছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
তবে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের টেকসই উন্নয়ন।
বিএফডিসির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাথরঘাটায় ইলিশ উৎপাদনে দেখা যাচ্ছে ধীরগতির নিম্নমুখী প্রবণতা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এখানে ইলিশ কেনাবেচা হয় ১ হাজার ৬৮৪.৫৬ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৬২.২৪ মেট্রিক টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৮১.৯১ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন যা গত অর্থবছরের একই সময় থেকে কম। অন্যদিকে এখন নিষেধাজ্ঞা চলছে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে হতে চলতি অর্থবছরও প্রায় হয়ে যাবে। ফলে এবার উৎপাদন আরও কমতে যাচ্ছে বলেই মত সংশ্লিষ্টদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈরী আবহাওয়া, নদ-নদীর নাব্যতা সংকট, প্রজনন মৌসুমে প্রতিবন্ধকতা এবং আহরণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদনে পড়ছে এ প্রভাব।
ইলিশ একটি পরিবেশ-নির্ভর ও সংবেদনশীল মাছ হওয়ায় এর উৎপাদন ও সংরক্ষণে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু পাথরঘাটায় গবেষণা কেন্দ্র না থাকায় সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না প্রজনন ও অভিবাসনের। কঠিন হচ্ছে উৎপাদন সম্ভাবনা নিরূপণ। পাশাপাশি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণেও। ফলে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন পাথরঘাটায় একটি আধুনিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের। তাদের দাবি, এটি স্থাপিত হলে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধি, গুণগত মান উন্নয়ন এবং সংরক্ষণে বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।
জেলে রফিকুল ইসলাম ভাষায়, ‘আমরা বছরের পর বছর সমুদ্রে মাছ ধরছি, কিন্তু বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা পাই না। গবেষণা কেন্দ্র থাকলে উপকৃত হতাম।’
মৎস্যজীবীদের মতে, ইলিশ বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানিযোগ্য সম্পদ। পাথরঘাটায় গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে উৎপাদন ও মান উন্নত হবে, যা সুযোগ বাড়াবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের। পাশাপাশি টেকসই আহরণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ সম্ভব হবে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাজেদুল হক বলেছেন, পাথরঘাটায় গবেষণা কেন্দ্র না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। তার মতে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া এই অঞ্চলের প্রকৃত মৎস্য সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়। এখানে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা গেলে ইলিশের জীবনচক্র, উৎপাদন ও জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে, যা টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনায় হবে সহায়ক, এমনটাই মত তার।





