কুমিল্লায় বেপরোয়া অর্ধশত ‘কিশোর গ্যাং’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুমিল্লায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র বহনসহ নানা অপরাধে এসব গ্রুপের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারেও থামছে না তাদের তৎপরতা। সর্বশেষ সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অলিগলি থেকে পাহাড়ঘেরা এলাকা, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অর্ধশতাধিক গ্যাং।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩)। গত ১৮ সেপ্টেম্বর মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনও।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বলছে, ২০১৬ সাল থেকে কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন কিশোর গ্রুপের তৎপরতা দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও বাড়তে থাকে। কিশোরদের দলবদ্ধ চলাফেরা, মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা স্থানীয়দের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসব গ্রুপের পরিচয়ও একেক এলাকায় একেক নামে। স্থানীয়ভাবে ঈগল গ্রুপ, রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াড ও ক্রাইম সেটআপসহ বিভিন্ন নামে সক্রিয় এসব গ্যাং।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ২০১৬ সাল থেকে চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের দ্বারা হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১৪টি। এর মধ্যে ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট নগর উদ্যানের সামনে দুই কিশোর গ্রুপের বিরোধের জেরে মো. শাহাদাত হোসেন (১৫) নামে এক কিশোরকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর দক্ষিণ চর্থার বড়পুকুরপাড় এলাকায় থার্টিফার্স্ট নাইটের একটি অনুষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে ফয়সাল ইসলাম হৃদয় (১৮) নামে এক যুবককে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর নগরীর অশোকতলা এলাকায় সজীব হোসেন ওরফে বাবু (২২) নামে এক যুবককে মারধর ও ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। তাঁর ভাষ্য, গত ১৫ দিনে অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সদস্যকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার ও অভিযানই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টরা। মানবাধিকার কর্মী ফারহা এমদা ইম্পা কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতাকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাংকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয়তার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
তবে এ অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম। তাঁর দাবি, বর্তমান ক্ষমতাসীন কোনো রাজনীতিবিদ কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেন না এবং এসব গ্রুপ এখনো ছাত্রলীগের নেতৃত্বে চলছে। তিনি কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয়তা বাড়ানোর কথা বলেছেন।
কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপরই জোর দিয়েছেন পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং সন্তান কখন, কোথায় ও কী করছে, সে বিষয়েও অভিভাবকদের খোঁজ রাখার কথা বলেছেন তিনি।





