পায়রা নদীর ব্লক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
- নিম্নমানের বালু ব্যবহারের অভিযোগ
- নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা
- বিতর্কের মধ্যেই ব্লক নির্মাণ শুরু
- ব্যাহত হতে পারে তীর রক্ষার উদ্দেশ্য

বরগুনার আমতলীতে পায়রা নদীর ভাঙন রোধে ব্লক নির্মাণকাজে লবণাক্ত ও নিম্নমানের বালু ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, নির্ধারিত মানের বালু ব্যবহার না করলে নির্মিত ব্লক দ্রুত ক্ষয়ে নষ্ট হতে পারে। এতে নদীভাঙন রোধে সরকারের শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজের সুফল ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
পায়রা নদীর ভাঙন রোধে ব্লক নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য নদীতীর রক্ষা করা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের বসতভিটা ও সম্পদকে ভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া। এ ধরনের প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রীর মান নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন তীরবর্তী বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, গত বুধবার থেকে নিম্নমানের ব্লক নির্মাণ শুরু করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বালুর সূক্ষ্মতা গুণাঙ্ক বা এফএম মান পরীক্ষা করেই তা নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্লকের নমুনা পরীক্ষায় মান নিয়ে কোনো সমস্যা পাওয়া গেলে সেগুলো বাতিল করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারাও বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
পাউবোর তথ্য বলছে, পায়রা নদীর ভাঙন রোধে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্লক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আমতলীর চাওড়া ইউনিয়নের বৈঠাকাটা এলাকায় ৪৩/১ নম্বর এবং আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের পশুরবুনিয়া এলাকায় ৪৪/বি নম্বর পোল্ডারে ৪ হাজার ৫০০ মিটার ব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৬ কোটি টাকা। ১৩টি প্যাকেজে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত দুই বছর কয়েকটি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে ৪৩/১ নম্বর পোল্ডারের ৩ ও ৪ নম্বর প্যাকেজে ৬০০ মিটার এবং ৪৪/বি নম্বর পোল্ডারের ১৪ ও ১৫ নম্বর প্যাকেজে আরও ৬০০ মিটার ব্লক নির্মাণকাজ চলছে। এই চার প্যাকেজে ১ হাজার ২০০ মিটার ব্লক নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ন্যাশনটেক নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
তবে চলমান কাজের উপকরণের মান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম থেকে আনা লবণাক্ত বালু নির্মাণস্থলে স্তূপ করে রাখা হয়েছে এবং সেই বালু দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে ব্লক। তাদের দাবি, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ব্লক নির্মাণে সিলেকশন বালু ব্যবহার করতে হবে, যার এফএম মান-২-এর বেশি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ব্যবহৃত বালুতে সেই মান নেই।
নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালুর মান নিয়ে উদ্বেগের কথা পাউবো কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পরও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা হাসেম, আব্দুল ও খায়রুল ইসলামের ভাষায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম থেকে লবণাক্ত বালু এনে নির্মাণস্থলে স্তূপ করে রেখেছে। গত বুধবার সেই বালু দিয়েই ব্লক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
পাউবোর এক ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট বললেন, ‘নির্মাণস্থলে স্তূপ করে রাখা বালুর এফএম মান প্রয়োজনীয় মাত্রায় নেই। এ বালু দিয়ে ব্লক তৈরি করা হলে সেগুলো বেশিদিন টিকবে না।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ন্যাশনটেকের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আবুল খায়েরের ভাষ্য, বালুর এফএম মান পরীক্ষা করে তা নির্মাণস্থলে নেওয়া হয়েছে। এই বালু দিয়ে তৈরি ব্লক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পরীক্ষা করানো হবে। পরীক্ষায় মানের ঘাটতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্লক বাতিল করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. গোলাম ফারুকও বালুর মান নিয়ে কোনো সমস্যা নেই বলে দাবি করেন। তিনি বললেন, ‘স্তূপ করে রাখা বালু দিয়েই ব্লক নির্মাণ শুরু হয়েছে। নির্মাণ শেষে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করলে কোনো ত্রুটি থাকলে তা ধরা পড়বে। সমস্যা পাওয়া গেলে পাউবো কর্তৃপক্ষ ব্লক বাতিল করবে।
স্তূপে থাকা কিছু বালুর এফএম মান কম থাকলেও সব মিলিয়ে মান ঠিক আছে— দাবি বরগুনা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজিজুল হক সুজনের। তবে সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী হান্নান প্রধান বললেন, ‘বালুর এফএম মান ঠিক না থাকলে তা দিয়ে ব্লক নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



