সব হারিয়েও বেঁচে থাকার নীরব লড়াই

বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া বাঁশখালীর একটি এলাকা
গুনাগরী, কোকদণ্ডী, ইলশা, চাঁপাছড়ি, বাহারছড়া ও দিঘীরপাড়া—বাঁশখালীর এই ছয় এলাকা ঘুরে চোখে পড়ল একই দৃশ্য। গাছপালার ফাঁক দিয়ে যতদূর চোখ যায়, শুধু ঘোলাটে পানি। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আধডোবা ঘরবাড়ি, স্কুল-মাদ্রাসা, আর সেই পানি ঠেলে জীবন বাঁচাতে ছুটে চলা মানুষ।
যে পথে শিক্ষার্থীরা যেত, সেখানে এখন থই থই পানি। কোকদণ্ডী এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশাল আঙিনা এখন পুরোপুরি জলাশয়। তিনতলা ভবনের নিচতলা পানিতে ডুবে আছে। মাঠজুড়ে যে ধানক্ষেত ছিল তার সবুজ ডগাগুলো শুধু পানির ওপর উঁকি দিচ্ছে। ভবনের সামনে দুই-একজন মানুষকে দেখা গেল পানি ঠেলে হেঁটে যেতে। ঠিক পাশেই আরেকটি প্রতিষ্ঠানের হলুদ-সাদা রঙের ভবনও একইভাবে জলমগ্ন। চারদিকের সবুজ শ্যাওলা জমে পানির ওপর সবুজ আস্তরণ পড়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে পানি একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে- তারই প্রমাণ।
গুনাগরী-মোশাররফ আলী মিয়ার বাজার সংযোগ সড়কে দেখা গেল এক দীর্ঘ মিছিল—কিন্তু এ কোনো উৎসবের মিছিল নয়, জীবন বাঁচানোর কঠিন সংগ্রাম।
গাছের ছায়ায় ঢাকা সরু রাস্তায় হাঁটুসমান ঘোলা পানি ভেঙে সারিবদ্ধভাবে হেঁটে চলেছেন মানুষ। কারও কাঁধে চালের বস্তা, কারও হাতে পলিথিনে মোড়ানো সংসারের সবটুকু সম্বল। একজন যুবক দড়ি দিয়ে বেঁধে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন গোয়ালের গরুটিকে। পথের ধারে একটি মোটরসাইকেল ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন এক ব্যক্তি। তার পাশ দিয়ে কোনোমতে পানি ভেঙে এগোচ্ছে একটি সিএনজি অটোরিকশা। মসজিদের মিনার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার আশপাশের সব রাস্তাই পানির নিচে।
ইলশা ও দিঘীরপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল নারীদের সংগ্রাম। বোরকা ও শাল জড়িয়ে কোমরসমান পানি ভেঙে হেঁটে চলা কয়েকজন নারীকে দেখা গেল। প্রত্যেকের হাতে বা মাথায় পলিথিনে মোড়ানো কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। পেছনে থাকা পুরুষদের ব্যাগেও একই রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কারও মুখেই স্বস্তির ছাপ নেই। তবু না থেমে এগিয়ে চলেছেন সবাই। হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়ি। নয়তো আশ্রয়কেন্দ্র।
এই গ্রামের বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন বললেন, ‘এখানে কেউ ত্রাণ দিতে আসেনি। সবাই সড়কের পাশে উঁচু এলাকায় দিয়ে চলে যাচ্ছে। তবে এলাকার বিত্তবান লোকজন এগিয়ে এসেছেন। নিজের ঘর ভেঙ্গে গেলেও একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’
চাঁপাছড়ির একটি বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, নীল টিনের বেড়া দেওয়া ঘরের প্রায় পুরোটাই পানির নিচে। শুধু সবুজ চালের অংশ আর জানালার একটুখানি ফাঁক পানির ওপর জেগে আছে। ঘরের সামনে ভাসছে পলিথিনে মোড়ানো কয়েকটি বস্তা। হয়তো তড়িঘড়ি বের করে আনা চাল বা কাপড়। যা শেষরক্ষা পায়নি পানির তোড়ে। ঘরের মালিক কোথায় গেছেন, তার কোনো চিহ্ন নেই আশপাশে। বাড়ি-ঘর ছেড়ে সবাই নিরাপদ স্থানে চলে গেছে বলে জানালেন ওই এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আরিফ। বললেন, ‘ঘরে কোমর সমান পানি ছিল। দুই রাত ঘুমাতে পারিনি। আজকে কিছুটা কমেছে। তাই বাড়িতে আসছি।’
পূর্ব ইলশায় পানির মধ্যে একটি অস্থায়ী ভেলায় চড়ে যাওয়া কয়েকজন তরুণকে দেখা গেল। বাঁশের লাঠি দিয়ে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে নিচ্ছেন ভাসমান একটি কাঠের পাটাতন বা ভাঙা দরজাকে। নৌকা নেই, তাই যা হাতের কাছে পেয়েছেন তা দিয়েই তৈরি করে নিয়েছেন যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা। পেছনে টিনের চালার একটি ঘর আধডোবা অবস্থায়। চারপাশে কলাগাছের ঝোপ পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে।
পশ্চিম চাঁপাছড়ির ভেল্লাপাড়ায় গিয়ে জানা গেল, মোক্তার ও তার ভাইয়ের ঘরটি আর নেই। পানির তোড়ে ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি। একই দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে উত্তর বাহারছড়ার দিঘীরপাড়ায়ও। এই এলাকার আবছার, জাফর, জামাল ও ফোরকানের মাটির ঘরও ভেঙে গেছে বানের পানিতে। একসময় যেখানে ছিল তাদের সংসার, এখন সেখানে শুধু কাদামাটি আর ভাঙা দেয়ালের চিহ্ন।
এলাকার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মাসুম জানান, শুধু এই কয়েকটি ঘর নয়-অধিকাংশ মাটির ঘরই পানিতে ধুয়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। একই এলাকার গৃহিণী মোকাররমা জানান, তিনদিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। এক দুর্বিষহ জীবন যাপন। চারদিকে পানির কারণে খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।
এছাড়াও মুরগীর ফার্মগুলো শূন্য। সব ভেসে গেছে। অনেক গৃহপালিত পশু, গরু মারা গেছে। ভেসে গেছে অনেকের হাঁস-মুরগী। এই ছয় এলাকার প্রতিটি দৃশ্যই যেন একে অপরের প্রতিচ্ছবি— থই থই পানি, ডুবে থাকা ঘরবাড়ি ও স্কুল। আর তার মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কঠিন সংগ্রাম। কারও মুখে অভিযোগ নেই, নেই উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ-শুধু বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এগিয়ে চলার এক ধরনের নিঃশব্দ দৃঢ়তা। কবে এই পানি নামবে। কবে ফিরবে স্বাভাবিক জীবন। উত্তরহীন এই প্রশ্ন নিয়েই দিন কাটছে বাঁশখালীর মানুষের।







