সূর্য ডুবে গেলে অনুষ্ঠান বন্ধ : সিএমপি

সূর্যাস্তের সাথে সাথে সব অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। নববর্ষ বরণের আয়োজকদের এভাবে কড়া বার্তা দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের নিরাপত্তায় চার স্তরের বলয় গড়ে তোলার পরিকল্পনা সাজিয়েছে পুলিশ।
প্রতিবছরের মতো এবারও নগরীর ডিসি হিল এবং সিআরবির শিরিষতলাকে মূল ভেন্যু ধরে নিরাপত্তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সিএমপি। শিল্পকলা একাডেমি, এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গন, জেএম সেন হল প্রাঙ্গনসহ আরও কয়েকটি স্থানে চৈত্র সংক্রান্তি এবং বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল আয়োজনগুলোতে যুক্ত হয়েছে বিএনপিপন্থী সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনগুলো। এ নিয়ে মতদ্বৈততা থাকলেও সকল আয়োজন সুশৃঙ্খল রাখতে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
বর্ষবরণের আয়োজন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিরাপত্তা হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন সিএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া,‘আজ (রোববার) বিকেলে আমরা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছি। বর্ষবরণ নিয়ে কোনো হুমকি দেখছি না। তবে আয়োজনকে সুশৃঙ্খল রাখতে আমরা প্রতিটি ভেন্যুতে চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলবো। সিএমপির ক্রাইম ডিভিশন, ডিবি, সিটি এসবি, সোয়াত টিম, ট্রাফিক বিভাগ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বর্ষবরণের আয়োজনগুলো বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে বাধ্য করতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিরাপত্তার নামে এমন বাড়াবাড়ি নিয়ে ক্ষোভ ছিল চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে। বিএনপি সরকারের আমলের প্রথম বর্ষবরণের আয়োজনেও সেই ধারাবাহিকতাই ধরে রাখতে চায় সিএমপি।
আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যা থেকে মূল ভেন্যুগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সূর্যাস্তের মধ্যেই কিংবা সাথে সাথে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। সূর্যাস্তের পর আমরা আর এক মিনিটও কোনোভাবে কাউকে অ্যালাউ করবো না। এটা আমরা সকল আয়োজক সংগঠনকে জানিয়ে দিয়েছি।’
ডিসি হিল ও সিআরবিকে ঘিরে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। নগরীর লাভ লেইন, চেরাগী পাহাড়, এনায়েত বাজার মোড় ও বোস ব্রাদার্স মোড় থেকে ডিসি হিলমুখী সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। এছাড়া নগরীর কদমতলী, স্টেডিয়ামের পশ্চিম কর্নার, রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের পাশ থেকে সিআরবিতে ঢোকার রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখবে।
নগরীর ডিসি হিলে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে। ১৯৭৮ সাল থেকে সেখানে অনুষ্ঠান করে আসছিল ‘সম্মিলত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ’। বিএনপিপন্থীদের চাপ সামলাতে জেলা প্রশাসন নিজেরা এবার সেখানে অনুষ্ঠান আয়োজন করে। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে আছেন জাসাসের নেতাকর্মীরা। এরপর পরিষদ শহীদ মিনারে অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নিলেও পুলিশের অনুমতি পেতে ব্যর্থ হয়।
এ অবস্থায় জেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণে তারা ডিসি হিলের আয়োজনে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন বলে জানালেন পরিষদের সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলী টিটো, ‘৫০টার মতো সংগঠন ডিসি হিলে পারফর্ম করবে। গান, আবৃত্তি, নৃত্যসহ আগে যা যা হতো, সবই হবে।’
পরিষদের এক নেতা জানালেন, বিএনপিপন্থীদের চাপে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ কয়েকটি সংগঠনকে ডিসি হিলে অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
মোহাম্মদ আলীর টিটোর ভাষ্য, দুইভাগে বিভক্ত উদীচীর একাংশ সিআরবির শিরিষতলার আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আছে। আরেক অংশ নন্দনকানন বোস ব্রাদার্সের সামনে আলাদা অনুষ্ঠান করছে। এজন্য তাদের ডাকা হয়নি। আরও কয়েকটি সংগঠন যারা ডিসি হিলে প্রোগ্রাম করবে না, তাদের শিল্পকলা একাডেমিতে যুক্ত করা হয়েছে।
আয়োজনকে সুশৃঙ্খল রাখার স্বার্থে ‘আনএক্সপেক্টেড’ কয়েকটি সংগঠনকে জেলা প্রশাসনের অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপকমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সকাল ৮টায় সার্কিট হাউজের সামনে থেকে ১০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানান জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ আয়াজ মাবুদ।
সিআরবিতে বিএনপিপন্থীরা এবং মূল আয়োজক নববর্ষ উদযাপন পরিষদ মিলেমিশে চৈত্র সংক্রান্ত ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন করছে। পরিষদের সদস্য সচিব ফারুক তাহের ৯৪টি সংগঠন তাদের অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে বলে জানান, ‘চৈত্র সংক্রান্তিতে দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ও পহেলা বৈশাখে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রোগ্রাম হবে। জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে আয়োজন শেষ হবে। মেয়র মহোদয় দুইদিনের আয়োজনেই উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন।’
‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ – এ প্রতিপাদ্য নিয়ে চৈত্র সংক্রান্তির রাতে নগরীর এনায়েত বাজার বৌদ্ধমন্দির সড়ককে রঙে রঙে সাজানোর প্রস্তুতি নিয়েছে ‘জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, চট্টগ্রাম’। পরদিন এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে থাকছে দিনব্যাপী বর্ষবরণের আয়োজন। বোধন আবৃত্তি পরিষদ নগরীর জেএম সেন হলে দিনব্যাপী পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান করবে।
শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশ কেন্দ্র ফুলকি আজ রোববার থেকে ‘ছোটদের বৈশাখী মেলা’ শুরু করেছে। তিনদিনের আয়োজনে ফুলকিতে থাকছে যুদ্ধবিরোধী মানববন্ধন, গান, চলচ্চিত্র, ব্রতচারী, জাদু প্রদর্শনীসহ ব্যতিক্রমী আরও নানা অনুষ্ঠান।

