বারবার স্থগিত চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচন, নেপথ্যে কে?

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে কাঙালিনী সুফিয়া গেয়েছিলেন,‘পরাণের বান্ধব রে, বুড়ি হইলাম তোর কারণে’। দেশের প্রাচীনতম বাণিজ্য সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বারেরও দশাও এখন এই গানের মতো। কারণ, গত ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে নেই কোনো কমিটি। আদালতে দায়ের করা অপ্রত্যাশিত মামলায় আটকে যাচ্ছে নির্বাচন।
গত আট মাস ধরে চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচন আইনি জটিলতায় বন্দি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে পাঁচবার স্থগিত হয়েছিল শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য সংগঠনের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনটি। এই দীর্ঘ অচলাবস্থার নেপথ্যে যে নামটি বারবার সামনে এসেছে, তিনি হলেন গার্মেন্টসের পণ্য সরবরাহকারী মুহাম্মদ বেলাল হোসেন। এক সালিশী ট্রাইব্যুনালের রায়ে বেলালের এসব কর্মকাণ্ডকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ অভিহিত করে খারিজ করে দেওয়া হয় তার আবেদনটি। ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে আরো যে বিষয়টি ওঠে আসে ‘এই আবেদন করার কোনো ‘আইনগত অধিকার’ বা ‘লিগ্যাল ইন্টারেস্ট’ নেই তার।
এফবিসিসিআইয়ের নিজস্ব সালিশী ট্রাইব্যুনালে বেলালসহ তিনজনের আবেদন নিষ্পত্তি করে উচ্চ আদালতকে অবহিত করতে দেওয়া হয় নির্দেশ। তারপর সালিশী ট্রাইব্যুনাল শুনানি শেষে মামলাটির বিষয়ে দেওয়া হয় এই পর্যবেক্ষণ। বেলালের সঙ্গে অন্য দুজন আবেদনকারী হলেন-চেম্বার নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী একটি গ্রুপের প্যানেল লিডার এস এম নুরুল হক ও একই গ্রুপের সদস্য আজিজুল হক।
কে এই বেলাল?
মামলার নথিপত্র ও ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, নিজেকে চট্টগ্রাম চেম্বারের একজন সাধারণ সদস্য এবং ‘হার্বিস কনভার্টিং লিমিটেড’ নামক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন মুহাম্মদ বেলাল। তবে মামলার শুনানিতে তার সাংগঠনিক পরিচয় নিয়ে পাওয়া গেছে স্ব-বিরোধী তথ্য। কখনও নিজেকে সাধারণ সদস্য, আবার কখনও একটি নির্দিষ্ট ট্রেড গ্রুপের (চট্টগ্রাম গার্মেন্ট এক্সেসরিজ গ্রুপ) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করছেন তিনি। একই ব্যক্তি দুটি ভিন্ন শ্রেণির সদস্য হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন না—এই যুক্তিতে তার আবেদনটি খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল।
আদালতের এরকম পর্যবেক্ষণের পরও মুহাম্মদ বেলালের মন খারাপ হয়নি। ‘আমার আবেদন খারিজ করলেও আমার প্রকৃত চাওয়া উপলব্ধি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বিগত সরকারের সময় চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতৃত্ব কুক্ষিগত করে রেখেছিল একটি সিন্ডিকেট। আমরা চেম্বারের অকাল দশা থেকে উদ্ধারের পর একটি নতুন চক্র সেই একই পথে হাঁটছে। একটি জেনুইন সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব করায় আমাকে ট্রেড গ্রুপ থেকে কৌশলে বাদ দিয়ে বিরত রাখা হয়েছে নির্বাচন থেকে।’
মামলা করে চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে একটি পক্ষকে বাড়তি সুবিধা দিতে চাইছেন কিনা এই প্রশ্নের জবাবে বললেন বেলাল, ‘আমি তো নির্বাচন করছি না। কাকে বাড়তি সুবিধা দিব?’
উল্লেখ্য, বেলালের বড় ভাই এস এম মোহাম্মদ আইয়ুব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন নুরুল হকের ব্যানারে।
আইনি লড়াই ও অভিযোগের ধরণ
মূলত ট্রেড গ্রুপ থেকে নির্বাচনে লড়তে চেয়েছিলেন বেলাল। কিন্তু চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনী বোর্ড খারিজ করে দেয় তার আবেদনটি। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই উচ্চ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে একের পর এক আইনি লড়াই শুরু করেছেন তিনি। তার অভিযোগ, চেম্বারের ভোটার তালিকা ও নির্বাচনী তফসিল নিয়ে। দাবি, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা অনুসরণ না করেই প্রণয়ন করা হয়েছে ভোটার তালিকা। এ অভিযোগের সূত্র ধরেই বারবার থমকে যায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
ট্রাইব্যুনালের কঠোর পর্যবেক্ষণ
এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনাল বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্যারাগ্রাফে বেলালের আবেদন খারিজের কারণ উল্লেখ করেছে। ট্রাইব্যুনাল দেখেছে, টাউন অ্যাসোসিয়েশন বা ট্রেড গ্রুপের যে ভোটার তালিকা চ্যালেঞ্জ করেছেন বেলাল, নিজে সেই গ্রুপগুলোর সদস্য নন তিনি। ফলে সেখানে তার কোনো সরাসরি আইনি স্বার্থ নেই। বেলাল চট্টগ্রাম চেম্বারের বিরুদ্ধে প্রথম মামলায় নিজের পরিচয় দেন সাধারণ সদস্য হিসেবে। পরে আরেক মামলায় অবস্থান পরিবর্তন করে ট্রেড গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে নিজের পরিচয় দেন। এভাবে বারবার পরিচয় পরিবর্তন করে সুবিধা নেয়ার প্রবণতাকে আদালত একই ব্যক্তির দুই শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে করেছেন সমালোচনা।
গত ২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে তার অভিযোগটি প্রত্যাহারের জন্য প্রথম আবেদন করেন তিনি। কিন্তু নাটকীয়ভাবে মাত্র তিন দিন পর ২৬ অক্টোবর পুনরায় আবেদন করে জানান, ভুলবশত প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া একই বিষয় নিয়ে তিনি একদিকে এফবিসিসিআই ট্রাইব্যুনালে ১২/২০২৫ নং মামলা করেন, অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে ১৬৯৭৬/২০২৫ নং রিট এবং আপিল বিভাগে ৫৭/২০২৬ নং লিভ টু আপিল দায়ের করেন।
চট্টগ্রাম চেম্বারে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুটি প্যানেল। একটি এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্ব ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম। আরেকটি হচ্ছে, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বে সমমনা পরিষদ।
সর্বশেষ ঘোষিত শিডিউল অনুযায়ী চট্টগ্রাম চেম্বারে চার ক্যাটাগরিতে ২৪ পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার কথা ছিল ৪ এপ্রিল। আর সেই পরিচালকদের ভোটে সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি, সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়। কিন্তু এফবিসিসিআই সালিশী ট্রাইব্যুনাল সর্বশেষ ২২ এপ্রিলের রায়ে সেই তফসিল বাতিল করে দিয়েছে নতুন তফসিলে সরাসরি নির্বাচনের নির্দেশনা। এখন সেই রায়ের ভিত্তিতে উচচ আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয় তা জানার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা।



