শুঁটকি পল্লীর ছোট্ট জোবাইদা এখন দ্রুত মানবী!

ছবি: আগামীর সময়
উপকূল মানেই ঝড়-ঝঞ্ঝা আর বিক্ষুব্ধ সাগরের সঙ্গে অসম লড়াই। সেই লড়াইয়ের যেন জীবন্ত প্রতিচ্ছবি জোবাইদা। ১১ বছর বয়সী এই শিশু হাঁটতে শেখার আগেই হারিয়েছে বাবাকে। মায়ের কোলেই কেটেছে তার শৈশবের কঠিন সময়। একটু বড় হতেই মায়ের হাত ধরে যুক্ত হয় শুঁটকি পল্লীর কঠিন শ্রমে।
তবে শুঁটকি মহালের সেই চড়া রোদে জোবাইদার স্বপ্ন একেবারে শুকিয়ে যায়নি। একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় একসময় তার ঠাঁই হয় স্কুলের আঙিনায়। বইখাতার পাশাপাশি সে নাম লেখায় দৌড় প্রতিযোগিতাতেও। সেই জোবাইদাই আজ বুধবার সকালে চট্টগ্রামের পিটিআই মাঠে ১০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হয়ে দ্রুত মানবীর মুকুট পড়েছেন গলায়। চট্টগ্রামের বিভাগীয় পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতায়।
১০ জেলার চ্যাম্পিয়নকে পেছনে ফেলে জুবাইদা যখন বিজয়ের শেষ রেখাটি (ফিনিশিং লাইন) ছুঁয়ে দিল, গ্যালারিতে থাকা তার মা তখন আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে চাটগাঁইয়া ভাষায় চিৎকার করে উঠলেন, ‘আর মাইয়া জিত্তি! (আমার মেয়ে জিতেছে!)’ আমাদের দেশে জোবাইদের গল্প আসলে এরকমই-কষ্টের বেড়ে উঠা। সংগ্রামী সংকল্প। অবশেষে মঞ্চের বিজয়।
জোবাইদা আক্তার কক্সবাজার উপকূলের বাঁকখালী নদীর মোহনার চৌফলদণ্ডীর মোহাম্মদ ইউসুফ ও নুরজাহান বেগমের মেয়ে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার ছোট জোবাইদা। পড়ে দক্ষিণ রাখাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে। বাবা ছিলেন মৎস্যজীবী। মা ছিলেন গৃহিণী। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম অর্থসংকটে পড়ে। সন্তানদের মুখে অন্ন জোগাতে মা কাজ নেন শুঁটকি পল্লীতে। সেখানেই জোবাইদার বেড়ে উঠা।
বেসরকারি সংস্থা ইপসার একটি প্রকল্পের আওতায় ভর্তি হয় স্কুলে। এরপর লং জাম্প, হাই জাম্প ও দৌড়সহ নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকে। গতবছর ১০০ মিটার দৌড়ে কক্সবাজার জেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়। এবারও জেলা পর্যায়ে সেরার মুকুট ধরে রেখে বিভাগীয় পর্যায়ে লড়তে আসে। সেখানেও বাজিমাত করে জোবাইদা।
এছাড়া জেলা পর্যায়ে হাই ও লং জাম্পে দ্বিতীয় স্থানও তার। বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে উচ্ছ্বসিত জোবাইদা জানালো তার স্বপ্নের কথা, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দৌড়াতে চাই।’ ভাবা যায়! অজপাড়া গাঁয়ের ১১ বছর বয়সী এক মেয়ে এখন স্বপ্ন দেখছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের।
শিক্ষার্থীর এমন অর্জনে উচ্ছ্বসিত তার স্কুলের শিক্ষকরাও। দক্ষিণ রাখাইনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহীন আক্তার জানালেন, ‘জোবাইদা লেখাপড়ায় মোটামুটি। কিন্তু খেলার প্রতি তার দারুণ ঝোঁক। সুবিধাবঞ্চিত শিশু হিসেবে আমরা শিক্ষকেরা সবসময় তার পাশে আছি।’
জোবাইদার পড়াশোনার যাবতীয় খরচ বহন করছে ইপসার ‘ফ্রি কিডস’ প্রকল্প। স্বাবলম্বী হতে তার মাকেও নানা সহায়তা করছে সংস্থাটি। ইপসার হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেছেন, ‘প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন অনেকেই হয়, তবে জোবাইদার চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা অন্য রকম। তাকে আমরা শুঁটকি পল্লী থেকে এনে স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। তার এই জয় আমাদেরও আনন্দে ভাসিয়েছে।’এই প্রকল্পটি মূলত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত পরিবারের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমাতে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
উপকূলের মানুষের দিনরাত কাটে প্রতিনিয়ত প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে। জোবাইদাও তার ব্যতিক্রম হবে কেন? তার বেড়ে উঠাওতো সাগরের পাড়ে। ছোট বেলা থেকেই শিখেছে উত্তাল সাগরের সঙ্গে লড়াই করে কিভাবে বেঁচে থাকতে হয়। প্রতিকূলতার এ সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ের বিশ্বমঞ্চে জোবাইদা একদিন হয়ে উঠবে উপকূলের সংগ্রামী মানুষের বিমূর্ত প্রতীক, পাবে দ্রুত মানবীর খেতাব!
মেয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যে নুরজাহান বেগমের প্রতিক্রিয়াটি ছিল আরও আবেগঘন। তিনি বললেন, ‘খুশিতে আজ ভাত না খেয়েও পেট ভরে আছে। এমন আনন্দ জীবনে আর কখনো হয়নি।’ ভাতের অভাবে দিন কাটানো মানুষের পক্ষেই কেবল অনুধাবন করা সম্ভব একজন মায়ের আনন্দের এই সীমা-পরিসীমা!




