সাপ নেই আয়ারল্যান্ডে!

সত্যি সাপ নেই আয়ারল্যান্ডে
সবুজ পাহাড়, কুয়াশায় মোড়া উপত্যকা, পাথুরে উপকূল আর শত শত বছরের পুরনো দুর্গ। এই অসাধারণ সুন্দর দ্বীপের আরেকটি পরিচয় আছে, যা শুনলে হয়তো চমকেই উঠবেন। দেশটিতে সাপ নেই।
হ্যাঁ, সত্যি তাই। এমন এক পৃথিবীতে আমরা বাস করি যেখানে মরুভূমি, তুন্দ্রা, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন, পাহাড় প্রায় সব ধরনের পরিবেশেই কোনো না কোনো সাপের দেখা মেলে। অথচ ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডে প্রাকৃতিকভাবে বসবাসকারী সাপের সংখ্যা শূন্য।
কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পাড়ি দিতে হবে কিংবদন্তি, বরফযুগ আর প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপের এক বিস্মৃত ভূদৃশ্যের ভেতর।
সাধু সাপ তাড়িয়ে ছিলেন!
আয়ারল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোককথাগুলোর একটি জড়িয়ে আছে সেন্ট প্যাট্রিককে ঘিরে। পঞ্চম শতকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য তিনি আয়ারল্যান্ডে আসেন। দেশটির মানুষ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে তাকে।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, একসময় তিনি একটি পাহাড়চূড়ায় টানা ৪০ দিন উপবাস ও প্রার্থনা করছিলেন। তখন অসংখ্য সাপ তাকে ঘিরে ধরে। ক্রুদ্ধ সেন্ট প্যাট্রিক তার অলৌকিক শক্তি প্রয়োগ করে সব সাপকে তাড়িয়ে সমুদ্রে ফেলে দেন। সাপগুলো আর কখনো ফিরে আসেনি।
শত শত বছর ধরে গল্পটি আয়ারল্যান্ডের লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। আজও দেশটির নানা স্মারক, উৎসব ও ধর্মীয় বর্ণনায় এই কাহিনির উল্লেখ পাওয়া যায়।
কিন্তু একটি ছোট সমস্যা আছে।
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, সেন্ট প্যাট্রিকের তাড়ানোর মতো কোনো সাপই সেখানে ছিল না।
যখন আয়ারল্যান্ড ছিল বরফের রাজ্য
আজ থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে ইউরোপের বড় অংশ ঢেকে ছিল বিশাল হিমবাহে। আয়ারল্যান্ডও ছিল সেই বরফ সাম্রাজ্যের অংশ। সেই সময় কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরে ঢাকা ছিল দ্বীপটি। এমন পরিবেশে সাপ তো দূরের কথা, অধিকাংশ প্রাণীরই টিকে থাকা ছিল অসম্ভব।
ধীরে ধীরে পৃথিবীর জলবায়ু উষ্ণ হতে শুরু করে। বরফ গলতে থাকে। প্রায় ১২ হাজার থেকে ১০ হাজার বছর আগে আয়ারল্যান্ড আবার প্রাণের জন্য বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
তখন বিভিন্ন প্রাণী নতুন আবাসের খোঁজে উত্তর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। হরিণ, বুনো শূকর, বাদামি ভালুক, লিংক্স এমন অনেক প্রাণী পৌঁছে যায় আয়ারল্যান্ডে।
কিন্তু সাপ পারেনি।
কারণ, তারা একটু দেরি করে ফেলেছিল।
সমুদ্রের ফাঁদে আটকে যাওয়া
বরফযুগের শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকে। গলতে থাকা হিমবাহ থেকে বিপুল পানি সাগরে জমা হচ্ছিল। একসময় ইউরোপের মূল ভূখণ্ড, ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ডের মধ্যে থাকা স্থলপথগুলো ডুবে যায় পানির নিচে।
প্রাণীরা যখন হেঁটে হেঁটে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। দ্রুতগতির অনেক প্রাণী এর আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু সাপের বিস্তার সাধারণত ধীর। তাদের নতুন এলাকায় বসতি গড়তে সময় লাগে। আয়ারল্যান্ডের চারপাশে সমুদ্রের বাধা তৈরি হওয়ার আগেই তারা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি।
ফলে ইতিহাসের এক অদ্ভুত দুর্ঘটনায় পুরো দ্বীপটিই সাপশূন্য থেকে যায়।
ব্রিটেনে সাপ আছে, আয়ারল্যান্ডে নেই কেন?
এখানেই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। কারণ, পাশের ব্রিটেনে সাপ রয়েছে। বর্তমানে ব্রিটেনে অ্যাডার, গ্রাস স্নেক এবং স্মুথ স্নেকসহ কয়েকটি প্রজাতির সাপ পাওয়া যায়। বিশেষ করে অ্যাডার ব্রিটেনের একমাত্র বিষধর সাপ।
তাহলে একই অঞ্চলের দুটি দ্বীপের মধ্যে এমন পার্থক্য কেন? কারণ ব্রিটেন দীর্ঘ সময় ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সাপগুলো সেই সুযোগে সেখানে পৌঁছে যায়। পরে সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়লেও তারা এরই মধ্যে বসতি গড়ে ফেলেছিল। আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ আর তৈরি হয়নি।
জীবাশ্মও দেয় একই সাক্ষ্য
বিজ্ঞানীরা কোনো এলাকায় অতীতে কোনো প্রাণী ছিল কি না, তা জানার জন্য জীবাশ্ম পরীক্ষা করেন। আয়ারল্যান্ডে হাজার হাজার বছরের নানা প্রাণীর জীবাশ্ম পাওয়া গেছে। কিন্তু স্থানীয় সাপের জীবাশ্ম কার্যত অনুপস্থিত।
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। কারণ, পৃথিবীর এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে বর্তমানে সাপ নেই, কিন্তু অতীতে ছিল, তার প্রমাণ হিসেবে জীবাশ্ম পাওয়া যায়।
আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে সেই প্রমাণও নেই। অর্থাৎ যতদূর জানা যায়, দ্বীপটিতে কখনোই প্রাকৃতিকভাবে সাপের স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে ওঠেনি।
তবে একটি প্রাণী আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে
আয়ারল্যান্ডে হাঁটতে গিয়ে যদি হঠাৎ লম্বা, চকচকে, সাপের মতো দেখতে কোনো প্রাণী চোখে পড়ে, ভয় পাওয়ার কারণ নেই। সেটি স্লো ওয়ার্ম। নাম শুনে অনেকেই সাপ ভাবেন। আসলে এটি এক ধরনের পা-বিহীন টিকটিকি। বিবর্তনের ধারায় এর পা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দেখতে অনেকটা ছোট সাপের মতো হলেও এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রাণী।
মজার বিষয় হলো, এটিও আয়ারল্যান্ডের আদিবাসী প্রাণী নয়। ধারণা করা হয়, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মানুষই এটিকে সেখানে নিয়ে আসে।
একমাত্র স্থানীয় সরীসৃপ
আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় সরীসৃপ বলতে মূলত একটি প্রাণীকেই বোঝানো হয়। সেটি হলো ভিভিপেরাস লিজার্ড বা সাধারণ টিকটিকি। বরফযুগের পর কোনো এক সময় এটি দ্বীপটিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের প্রাকৃতিক পরিবেশে এটিই সবচেয়ে পরিচিত স্থানীয় সরীসৃপ।
ভাবুন তো, এমন একটি দেশ যেখানে শত শত প্রজাতির পাখি, অসংখ্য স্তন্যপায়ী প্রাণী, নানা ধরনের মাছ ও উভচর প্রাণী আছে, কিন্তু স্থানীয় সরীসৃপ বলতে প্রায় একটিই।
ভবিষ্যতে কি সাপ দেখা যেতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি ‘না’ নয়। বর্তমানে আয়ারল্যান্ডে পোষা সাপ রাখা বৈধ। ফলে কেউ যদি অসাবধানতাবশত বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো সাপ প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়, তাহলে সীমিত পরিসরে তাদের দেখা মিলতে পারে। তবে স্থায়ী জনসংখ্যা গড়ে তোলা সহজ হবে না।
কারণ, আয়ারল্যান্ডের জলবায়ু এখনো তুলনামূলক শীতল এবং দ্বীপটির বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে সাপবিহীন অবস্থায় গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাইরের কোনো সাপ প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে তা স্থানীয় প্রাণীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দ্বীপাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র সাধারণত বহিরাগত প্রাণীর প্রতি খুব সংবেদনশীল।
বিরল কিন্তু আরও নজির আছে
পৃথিবীতে এমন দেশ বা অঞ্চল খুব বেশি নেই যেখানে কোনো স্থানীয় সাপ নেই। আয়ারল্যান্ড সেই বিরল তালিকার অন্যতম সদস্য। এর সঙ্গে রয়েছে আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড এবং অ্যান্টার্কটিকার মতো অঞ্চল।
তবে আয়ারল্যান্ডের গল্পটি আলাদা। কারণ এখানে সাপের অনুপস্থিতি কোনো অলৌকিক ঘটনার ফল নয়, আবার কোনো বিশেষ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কারণেও নয়। এর পেছনে কাজ করেছে ভূতত্ত্ব, জলবায়ু, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং সময়ের নির্মম হিসাব।
হয়তো কোনো একসময় সাপগুলো আয়ারল্যান্ডের পথে রওনা হয়েছিল। কিন্তু সমুদ্র তাদের আগে পৌঁছে গিয়েছিল।
আর সেই কারণেই আজও আয়ারল্যান্ডের সবুজ পাহাড়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘাসের ফাঁকে সাপের ফোঁসফোঁস শব্দ শোনার ভয় নেই। সেন্ট প্যাট্রিকের গল্পটি রয়ে গেছে লোককথায়, আর সাপগুলো রয়ে গেছে দ্বীপের বাইরে, হাজার বছরের জন্য।












