ডেমোক্র্যাট নাকি রিপাবলিকান
মার্কিন ইতিহাসে কারা বেশি যুদ্ধবাজ

প্রতীকী ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান দুই দলের মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য দৃশ্যমান। তবে ‘যুদ্ধ’ প্রশ্নে দেখা যায়, তারা প্রায়ই একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসা রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নাম। নির্বাচনি প্রচারণায় নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ট্রাম্প। তার প্রথম মেয়াদে কোনো নতুন যুদ্ধ শুরু হয়নি বলেও প্রচারণা চালান তিনি।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন নেতাকে হত্যা করে ট্রাম্পের বাহিনী। এরপর একের পর এক হামলায় হত্যা করে শীর্ষ নেতাদের। ইরানে প্রকাশ্য মার্কিন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে ঠেলে দিয়েছে এক ভয়ংকর পরিণতির দিকে।
এর আগে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এ ছাড়া ট্রাম্প লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে দিয়ে আসছেন একের পর এক অভিযানের হুমকি। শুধু তাই নয়, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া কিংবা ইয়েমেন, ইরাক সিরিয়া কেউই ট্রাম্পের রক্তচক্ষু থেকে পায়নি রেহাই। এসব কিছু প্রমাণ করছে, মার্কিন মসনদে বসে যুদ্ধের মোহ ত্যাগ করা প্রায় অসম্ভব।
চলুন দেখে আসি মার্কিন ইতিহাসে কোন দলের প্রেসিডেন্টরা বেশি যুদ্ধবাজ ছিল।
ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট (ডেমোক্র্যাট: ১৯৩৩-১৯৪৫)
১৯৪১ সালে জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের পর রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি জড়িয়ে দেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। তার নির্দেশেই মার্কিন অর্থনীতিকে পরিণত করা হয় ‘অস্ত্রাগারে’।
আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণার আগেও তিনি আটলান্টিকে জার্মান সাবমেরিনের বিরুদ্ধে লড়তে পাঠিয়েছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীকে। তার সময়েই শুরু হয় ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দেয় পারমাণবিক বোমার যুগে।
হ্যারি এস ট্রুম্যান (ডেমোক্র্যাট: ১৯৪৫-১৯৫৩)
ট্রুম্যানই বিশ্বের ইতিহাসে একমাত্র নেতা যিনি আদেশ দিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দানে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের দুই শহরে তার নির্দেশে ফেলা বোমায় মারা যায় ২ লক্ষাধিক মানুষ।
এ ছাড়া জাতিসংঘের দোহাই দিয়ে তিনি ১৯৫০ সালে যুদ্ধ শুরু করেন উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে। মূল দুই প্রতিপক্ষ উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার এই কোরীয় যুদ্ধ বলতে গেলে আজও হয়নি শেষ।
জন এফ কেনেডি (ডেমোক্র্যাট: ১৯৬১-১৯৬৩)
কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাত করতে ১৯৬১ সালে বে অফ পিগ নামের সামরিক অফিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যদিও কেনেডির পরিচালিত এই অভিযানটি হয়েছিল ব্যর্থ।
ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় যুদ্ধ শুরু হয়েছিল জনসনের সময়। কিন্তু কেনেডিই প্রথম কয়েক হাজার ‘সামরিক উপদেষ্টা’ পাঠিয়ে ভিয়েতনামে করেছিলেন যুদ্ধের গোড়াপত্তন।
লিন্ডন বি জনসন (ডেমোক্র্যাট: ১৯৬৩-১৯৬৯)
১৯৪৬ সালে ভিয়েতনামের সঙ্গে শুরু হওয়া ছোট সংঘাতকে এক বিশাল যুদ্ধে রূপান্তর করেন জনসন। ১৯৬৮ সালের মধ্যে তিনি ভিয়েতনামে পাঠান ৫ লাখের বেশি মার্কিন সেনা।
উত্তর ভিয়েতনামের ওপর তিনি চালিয়েছিলেন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিমান হামলা, যেখানে সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর ব্যবহার করা হয়েছিল ‘নেপাম বোমা’ নামের এক প্রকার তরল আগুন।
রিচার্ড নিক্সন (রিপাবলিকান: ১৯৬৯-১৯৭৪)
ভিয়েতনাম যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিলেন নিক্সন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি লাওস এবং কম্বোডিয়ায় শুরু করেন ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এবং গোপন বোমাবর্ষণ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চালানো এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল লাখ লাখ টন বোমা।
এ ছাড়া ১৯৭৩ সালে চিলির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সিআইএকে সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন তিনি।
রোনাল্ড রেগান (রিপাবলিকান: ১৯৮১-১৯৮৯)
১৯৮৩ সালে ছোট দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডায় সরাসরি সেনা পাঠিয়ে সেখানকার সরকারকে বদলে দেন রেগান।
নিকারাগুয়ার সরকারকে উৎখাত করতে তিনি ‘কন্ট্রা’ বিদ্রোহীদের অবৈধভাবে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন, যা পরে ‘ইরান-কন্ট্রা স্ক্যান্ডাল’ হিসেবে পায় কুখ্যাত পরিচিতি।
১৯৮৬ সালে বার্লিন ডিস্কো ক্লাবে হামলার অজুহাতে তিনি নির্দেশ দেন লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে সরাসরি বিমান হামলার।
বিল ক্লিনটন (ডেমোক্র্যাট: ১৯৯৩-২০০১)
নব্বইয়ের দশকে ইউরোপের বলকান অঞ্চলে ন্যাটোর মাধ্যমে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছিলেন ক্লিনটন। কসোভো ও বসনিয়ায় চলা এই বলকান যুদ্ধে প্রভাব রেখেছিলেন তিনি।
১৯৯৮ সালে ইরাকের ওপর চারদিন ব্যাপী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ক্লিনটন নেতৃত্বাধিন যুক্তরাষ্ট্র, যা অপারেশন ডেজার্ট ফক্স নামে পরিচিত। এছাড়া সুদান এবং আফগানিস্তানে আল-কায়দার ঘাঁটিতে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলারও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
জর্জ ডব্লিউ বুশ (রিপাবলিকান: ২০০১-২০০৯)
বুশকে এখন পর্যন্ত ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ক্ষমতায় থাকাকালীন বুশ ঘোষণা করেন ডকট্রিন অব প্রি-এমপ্টিভ স্ট্রাইক নামের বিতর্কিত নীতি। এ নীতিতে কোনো দেশ হামলা করার আগেই তাকে আক্রমণ করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
যদিও তিনি কুখ্যাত হয়ে আছেন ইরাক ধ্বংসের কারিগর হিসেবে। ইরাকের ততকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের কাছে পরমাণু অস্ত্র আছে, এমন মিথ্যা অজুহাতে তিনি অভিযান চালিয়ে ধ্বংস করেন ইরাক।
এছাড়া বিন লাদেনকে ধরার নামে আফগানিস্তানে ২০ বছরের এক অন্তহীন যুদ্ধ শুরু করেন, যা ক্ষতি করে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের।
বারাক ওবামা (ডেমোক্র্যাট: ২০০৯-২০১৭)
শান্তিতে নোবেলজয়ী ওবামাকে আপাদদৃষ্টিতে কম যুদ্ধবাজ বলে মনে হয়।
তবে তিন বিশ্বের ইতিহাসে ড্রোন যুদ্ধের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত। ওবামা সরাসরি সেনা পাঠানোর বদলে আকাশপথে ড্রোন হামলার ব্যাপক বিস্তার ঘটান। পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় শত শত ড্রোন হামলায় নিহত হয় অসংখ্য সাধারণ মানুষ।
তিনি ২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে সরিয়ে লিবিয়াকে পরিণত করেন একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে সেখানে গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জো বাইডেন (ডেমোক্র্যাট: ২০২১-২০২৫)
বাইডেন সরাসরি নতুন কোনো বৃহৎ যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও তার শাসনকাল ছিল ‘ছায়া যুদ্ধ’ বা প্রক্সি ওয়ারে ভরপুর।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সেনা না পাঠিয়েও বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেন তিনি। যার মাধ্যমে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক বিশাল ছায়া যুদ্ধ পরিচালনা করেন বাইডেন।
এছাড়া ইসরায়েল-গাজা সংকটে নিঃশর্ত সামরিক সমর্থন দেয় তার সরকার। সিরিয়া-সোমালিয়ায় নিয়মিত ড্রোন হামলা চালিয়ে তিনি বজায় রেখেছিলেন ডেমোক্র্যাটদের চিরচেনা ‘হস্তক্ষেপ নীতি'।
কে বেশি আগ্রাসী?
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তগুলো এসেছে ডেমোক্র্যাটদের হাত ধরে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত দম্ভ ও সরাসরি দেশ দখলের উন্মাদনা দেখা গেছে রিপাবলিকানদের মধ্যে।
তবে ২০২৬ সালের ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ভাঙতে এসেছেন পূর্বের সব রেকর্ড। তিনি কেবল যুদ্ধ শুরুই করেননি, বরং আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করছেন রাষ্ট্রপ্রধানদের।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা কৌশলগত এবং আদর্শিক যুদ্ধে জড়িয়েছে বেশি। আর রিপাবলিকানরা জড়িয়েছে সরাসরি সামরিক শক্তির যুদ্ধে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ভুলে এখন রিপাবলিকানদের সেই পুরোনো ‘আক্রমণাত্মক’ ধারাকেই নিয়ে গেছেন চূড়ান্ত পর্যায়ে।
বর্তমান ইরান যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে হয়তো ট্রাম্পই হবেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ‘যুদ্ধবাজ’ প্রেসিডেন্ট।

