মধ্যপ্রাচ্যের ডাকে এশিয়া ছাড়ছে মার্কিন রণতরী, সুযোগ কি নেবে চীন
- আব্রাহাম লিংকনকে সরাতে মধ্যপ্রাচ্যের পথে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন; সাময়িকভাবে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে থাকবে না কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী

সংগৃহীত ছবি
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত সংঘাতের চাপ এবার সরাসরি পড়ছে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিতে। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন গত ৫ আগস্ট ভিয়েতনামের দা নাং সফর শেষ করে পশ্চিমমুখী যাত্রা শুরু করেছে। ১৩ আগস্টের মধ্যে রণতরীটিকে মালাক্কা প্রণালিতে দেখা যায়। সেখান থেকে ভারত মহাসাগর পেরিয়ে এখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে সরিয়ে তার জায়গা নেবে জর্জ ওয়াশিংটন। ফলে অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী থাকবে না।
এমন এক সময়ে এই পরিবর্তন ঘটছে, যখন দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জাপান ও ফিলিপাইনের উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানের যুদ্ধের প্রয়োজন মেটাতে এশিয়া থেকে এত বড় সামরিক শক্তি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
জাপানের ইয়োকোসুকা নৌঘাঁটিতে স্থায়ীভাবে মোতায়েন জর্জ ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ‘ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড’ বিমানবাহী রণতরী। গত ৩০ জুলাই এটি গাইডেড-মিসাইল ক্রুজার ইউএসএস রবার্ট স্মলস এবং ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস শুপকে সঙ্গে নিয়ে ভিয়েতনামের দা নাং বন্দরে পৌঁছায়। পাঁচ দিনের নির্ধারিত সফর শেষে সেখান থেকে বেরিয়ে পশ্চিমমুখী হয় রণতরী বহরটি। পরে মালাক্কা প্রণালিতে তাদের দেখা যায়। এই পথ ধরেই ভারত মহাসাগর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাওয়া সম্ভব।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও জর্জ ওয়াশিংটন ছিল দক্ষিণ চীন সাগরে। জুলাইয়ে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে একাধিক সামুদ্রিক সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে রণতরীটি মোতায়েন করেছিল। ২২ জুলাই লুজন প্রণালি অতিক্রম করে বহরটি দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশ করে। জাপানি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গেও মহড়া চালায় তারা। তখন ওয়াশিংটন এটিকে মুক্ত ও উন্মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগর রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিল।
এক মাসও পার হয়নি, সেই রণতরীই এখন মধ্যপ্রাচ্যের পথে।
দীর্ঘ মোতায়েনে ক্লান্ত লিংকন
জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর মূল কারণ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অস্বাভাবিক দীর্ঘ মোতায়েন। প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও মেরিন নিয়ে রণতরীটি গত বছরের নভেম্বরে সান ডিয়েগো ছেড়েছিল। পরে জানুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।
মে মাসে দেশে ফেরার কথা থাকলেও সংঘাতের কারণে লিংকনের মোতায়েন বারবার বাড়ানো হয়। এখন রণতরীটির মোতায়েন ২৬০ দিনেরও বেশি দীর্ঘ হয়েছে। দুই শতাধিক দিন কোনো বন্দরে না থেমে সমুদ্রে কাটিয়েছে এটি। আধুনিক মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে এমন দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান বিরল।
দীর্ঘদিন পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকা, বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া এবং যুদ্ধকালীন চাপের কারণে রণতরীটির নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
নাবিকদের পরিবার ও কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা জাহাজে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি, পানির সমস্যা, নালাব্যবস্থায় ত্রুটি, ডাক পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্ব এবং মানসিক চাপের অভিযোগ তুলেছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অবশ্য এসব প্রতিবেদনের অনেকটাই ‘ভুলভাবে উপস্থাপন’ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রণতরীটির দীর্ঘ মোতায়েনকে অতিরিক্ত বলে মানতে রাজি হননি।
তবু শেষ পর্যন্ত লিংকনকে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আর তাকে প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন সামরিক শক্তিতে তৈরি হয়েছে সাময়িক টান।
‘রণতরী-শূন্যতা’ কত দিনের
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে এই ‘রণতরী-শূন্যতা’ কত দিন থাকবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অন্য কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরী প্রশান্ত মহাসাগরে পাঠানো হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর চাপ কতটা বেড়েছে।
আর এখানেই সামনে আসছে চীনের প্রসঙ্গ।
গত ১ আগস্ট দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্কারবরো শোলের আশপাশে নৌ ও বিমান মহড়া চালায় চীনের সামরিক বাহিনী। ওই এলাকার মালিকানা দাবি করে চীন ও ফিলিপাইন উভয়েই। এর আগে জুলাইয়ে সেখানে চীনা ও ফিলিপাইনের জাহাজের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনাও ঘটে।
আবার ১২ আগস্ট তাইওয়ানের পূর্ব দিকে ইন্দোনেশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে চীনা নৌবাহিনীর মহড়াকে ‘বিপজ্জনক’ বলে সমালোচনা করে তাইপে। ইন্দোনেশিয়া অবশ্য জানিয়েছে, সেটি ছিল নিয়মিত ও সীমিত ধরনের যৌথ নৌ অনুশীলন।
জাপানের কাছাকাছিও সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে বেইজিং। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর সাময়িক অনুপস্থিতিকে নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব প্রদর্শনের সুযোগ হিসেবে নিতে পারে চীন।
এশিয়া ছাড়ার কথা অস্বীকার ওয়াশিংটনের
ওয়াশিংটন অবশ্য এশিয়া থেকে সরে যাওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অভিযান বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ফ্রাঙ্ক ব্র্যাডলি সম্প্রতি ম্যানিলা সফরে বলেছেন, ফিলিপাইনসহ এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া আরও বাড়াতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।
তার ভাষ্য, শক্তিশালী জোট ও নিয়মিত যুদ্ধপ্রস্তুতির মহড়াই বড় ধরনের সংঘাত ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
তাই জর্জ ওয়াশিংটনের বিদায় মানেই এশিয়া থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিদায় নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও গুয়ামে বড় মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। সাবমেরিন, ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক শক্তিও অঞ্চলে সক্রিয় থাকবে।
তবে বিমানবাহী রণতরী যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকগুলোর একটি। ফলে এর অনুপস্থিতির রাজনৈতিক বার্তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
ইরানের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের প্রশান্ত মহাসাগরেও ছায়া ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যে একটি ক্লান্ত রণতরীকে বিশ্রাম দিতে গিয়ে এশিয়া থেকে সরাতে হচ্ছে আরেকটি। আর ওয়াশিংটন যখন দুই প্রান্তে শক্তি ভাগ করে নিচ্ছে, বেইজিং তখন খুব কাছ থেকেই দেখছে সেই হিসাব।









