ইউক্রেন যুদ্ধ
ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ তোলার হিড়িক রাশিয়ায়!
- আগস্টের ২ সপ্তাহে গ্রাহকরা তুলেছেন ৩৪০ কোটি ডলার
- জুলাইয়ে বাণিজ্যিক হিসাবগুলো থেকে তোলা হয়েছে ৭৩০ কোটি

চলতি সপ্তাহেই এক দিনে রাশিয়াকে লক্ষ্য করে ৮২২টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। চার বছরের যুদ্ধে এটিই ছিল ইউক্রেনের পক্ষে সবচেয়ে বড় আক্রমণ। টানা যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকট আর প্রাণনাশের শঙ্কার ভেতর রাশিয়ার নাগরিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সম্পদ বাজেয়াপ্তের ভয়। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা তো বটেই, সাধারণ মানুষও ব্যাংকগুলো থেকে তুলে নিতে শুরু করেছেন অর্থ। ফলে রাশিয়ার ব্যাংক খাত মুখোমুখি হয়েছে গভীর তারল্য সংকটের। গত সাড়ে সাত মাসে দেশটির ব্যাংকগুলো থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ, যা মস্কোর যুদ্ধকালীন অর্থনীতি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে জন্ম দিয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগের। ওয়াশিংটন পোস্ট।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (সিবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহেই আমানতকারীরা বাণিজ্যিক হিসাব থেকে ২৮ হাজার ৬৪০ কোটি রুবল বা প্রায় ৩৪০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন। রাশিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা বলছেন, ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর সময় ব্যাংক খাতে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, এবার হয়তো তা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সিবিআরের ট্র্যাকিং ডেটার বরাত দিয়ে ফার্স্টপোস্টের প্রতিবেদন বলছে, সাত মাস ধরেই ধারাবাহিকভাবে মূলধন তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সাধারণ মানুষ যেভাবে ব্যাংক ও এটিএম বুথ থেকে অর্থ তুলছেন তা দেখে বোঝাই যায়, তারা কতটা উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।
রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে বাণিজ্যিক হিসাবগুলো থেকে ৭৩০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা, যা বছরের মধ্যে এক মাসে সর্বোচ্চ। জুনে যখন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোয় ড্রোন হামলা বাড়তে থাকে, তখন তুলে নেওয়া হয়েছিল ৪৫ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে গত ১ জানুয়ারি থেকে গ্রাহকরা সরিয়ে নিয়েছেন ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেশি। রুবলের হিসাবে যার পরিমাণ ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন।
এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনী যখন প্রথম ইউক্রেনে ঢোকে, তখন দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ২৩০ কোটি ডলার তুলে নিয়েছিলেন গ্রাহকরা। তবে সে সময় সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে বেশ িকছু পদক্ষেপ নিয়েছিল সরকার। যার মধ্যে ছিল কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণনীতি কার্যকর, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বেঞ্চমার্ক সুদের হার বাড়ানো। তবে এবার আর সেসব কাজে আসছে না। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোও সরিয়ে নিচ্ছে মূলধন।
সিবিআরের ত্রৈমাসিক আন্তর্জাতিক লেনদেনের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে রাশিয়া থেকে ৯৪০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে বা অফশোর হোল্ডিং অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছে। এমনিতেই রাশিয়ার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। তার ওপর সাপ্লাই চেইনে জটিলতা, রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানোর জন্য অতিরিক্ত করের মুখে পড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উভয়সংকটে রয়েছে। এ অবস্থায় নিজেদের সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকদের নাগালের বাইরে সুরক্ষিত রাখতেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে তাদের পরিচালন রিজার্ভ তুলে নিতে শুরু করেছে।
মূলত
ইউক্রেনের তীব্র ড্রোন হামলাই সাধারণ মানুষকে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করতে তাগিদ
দিচ্ছে। সংঘাতের শুরুতে এসব হামলা হচ্ছিল সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়। কিন্তু এখন মস্কো,
লেনিনগ্রাদের মতো শহরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় গিয়ে আঘাত হানছে ইউক্রেনের ড্রোন।
তেল শোধনাগার, জ্বালানি ডিপো এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সাবস্টেশনগুলো বারবার হামলার শিকার
হচ্ছে। ফলে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট, বেড়েছে দাম। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, রাশিয়ার
পেট্রলপাম্পগুলোয় তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন, এমনকি বেঁধে দেওয়া হচ্ছে জ্বালানি কেনার পরিমাণও।
হামলায় রাশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ই-কমার্স এবং রিটেল জায়ান্ট ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর সাপ্লাই
চেইন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু জুলাই মাসেই মধ্য রাশিয়ার ওয়াইল্ডবেরিজের ২০টির
বেশি বিশাল ডিস্ট্রিবিউশন হাবে হয়েছে ড্রোন হামলা। লাখ লাখ রুশ নাগরিক নিত্যপণ্যের
জন্য ওয়াইল্ডবেরিজের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের স্থাপনায় হামলার কারণে মারাত্মকভাবে
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা।
ড্রোন হামলা প্রতিরোধে জ্যামিং এবং ফোরজি ও ফাইভজি নেটওয়ার্ক সাময়িক বন্ধ রাখে রাশিয়া কর্তৃপক্ষ। ফলে সে সময়ের জন্য সব ধরনের ডিজিটাল লেনদেনও বন্ধ হয়ে যায়। দেশটির যেসব মানুষ স্মার্টফোন ব্যাংকিং বা ডেবিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল, তারা সে সময় খাদ্য বা জরুরি কিছুও কিনতে পারেন না। এ অবস্থায় নগদ অর্থই হয়ে পড়ে একমাত্র মাধ্যম। আর এ উপলব্ধি থেকেই তারা তুলে নিতে শুরু করেন অর্থ।
এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্পদ জব্দের ভয়। দেশটিতে গুঞ্জন উঠেছে, দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে আহত বা নিহত সেনাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে চাপ পড়েছে রাষ্ট্রীয় বাজেটে। এখন হয়তো খুচরা ব্যাংক আমানতের বিষয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। আর তাই আগেই নিজেদের অর্থ তুলে সুরক্ষিত থাকতে চাইছেন নাগরিকরা। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবারই বলছে, আমানত জাতীয়করণের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। কিন্তু তাতে আর আস্থা রাখতে পারছেন না রুশরা। এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর নগদ ব্যাংকনোট ফুরিয়ে যাওয়া ঠেকাতে দৈনিক বা মাসিক নগদ অর্থ উত্তোলনের সীমা বেঁধে দিতে পারে, এমন জল্পনাও চলছে। আর সব মিলিয়ে নগদ অর্থ তুলে নেওয়ার এ প্রবণতা রাশিয়ার বাণিজ্যিক ব্যাংক খাতকে ঠেলে দিয়েছে তীব্র তারল্য সংকটের মুখে। এখন রাশিয়া কীভাবে এ পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেটিই দেখার বিষয়।






