জোরালো হচ্ছে সুপার এল-নিনোর শঙ্কা, যেসব ঝুঁকিতে উত্তর আমেরিকা

সংগৃহীত ছবি
চলতি বছর সুপার এল-নিনো হওয়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। তা-ই যদি হয়, তবে চরম আবহাওয়া, খাদ্য পণ্যের উচ্চমূল্য এবং বৃহত্তর স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে উত্তর আমেরিকা। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।
এল নিনো শুরু হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও পূর্বাভাস দিচ্ছেন তারা।
এল নিনো বলতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় আবহাওয়ার একটি অবস্থাকে বোঝায় যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরে জমে থাকা উষ্ণ পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের এ উষ্ণতা যখন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন তাকে সুপার এল নিনো বলা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬৩ শতাংশ।
শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে উত্তর আমেরিকার আবহাওয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। এর প্রভাবে মহাদেশের দক্ষিণে আরও আর্দ্র ও ঝড়ো পরিস্থিতি এবং উত্তরে শুষ্ক ও উষ্ণ তাপমাত্রা দেখা দেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বেশি ঝড়
ন্যাশনাল ওশেনিক ও অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আবহাওয়াবিদ ন্যাট জনসন বলেছেন, শরৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়তে শুরু করবে। এতে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের খরা-পীড়িত রাজ্যগুলোকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, ঝুঁকি থাকবে বন্যার।
এল নিনোর কারণে আরও ভারী বৃষ্টিপাত এবং প্রবল ঝড়ো হাওয়া বইতে পারে। ‘শীতের শেষভাগে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাগুলো এ ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে’, যোগ করেন জনসন।
আবহাওয়াবিদ বাউলে বলছেন, এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ঝড়ের সংখ্যাও বাড়তে পারে।
এল নিনো সক্রিয় থাকলে জেট স্ট্রিম পূর্ব-পশ্চিমমুখী হয়ে ওঠে, ফলে ঝড়গুলো আরও দ্রুতগতিতে অঞ্চল অতিক্রম করতে পারে, যোগ করেন তিনি।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উষ্ণতর আবহাওয়া
জনসন বলেছেন, এল নিনোর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় জেট স্ট্রিম আরও দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আবহাওয়া আরও উষ্ণ ও শুষ্ক হয়ে উঠতে পারে ।
জনসন উল্লেখ করেন, ‘সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তুলনামূলকভাবে শুষ্ক থাকে। এছাড়া উত্তর রকি পর্বতমালায় তুষারপাতও কম হয়।’
বাউলের ভাষ্য, এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমের রাজ্যগুলো সাধারণত অনেক বেশি উষ্ণ ও শুষ্ক থাকে। কারণ, জেট স্ট্রিম তাদের দক্ষিণ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে এসব এলাকা ঝড়ের প্রধান পথের বাইরে থেকে যায়।
শক্তিশালী এল নিনোর কারণে সৃষ্ট আবহাওয়াগত পরিবর্তন সংক্রামক রোগের বিস্তারও বাড়াতে পারে। মশা ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে যায়। ২০১৫-১৬ সালের সুপার এল নিনোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, হান্টাভাইরাস এবং প্লেগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল।
কম ঘূর্ণিঝড়
উত্তর আমেরিকায় এল নিনোর প্রথম বড় প্রভাবগুলোর একটি হতে পারে অপেক্ষাকৃত শান্ত আটলান্টিক ঘূর্ণিঝড় মৌসুম। এই মৌসুম সাধারণত জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
টেক্সাস এ অ্যান্ড এম বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান গবেষক উইলিয়াম বাউলে উল্লেখ করেন, এল নিনোর সময় আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড় বা ক্রান্তীয় ঝড় গঠনের জন্য অনুকূল বায়ুপ্রবাহ থাকে না। তার মতে, বর্ধিত বায়ুপ্রবাহের কারণে বজ্রঝড়ের হারিকেনে পরিণত হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে, ব্যাখ্যা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (নোয়া) এ বছর আটলান্টিক অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় কম সক্রিয় ঘূর্ণিঝড় মৌসুমের পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এ বছর সর্বোচ্চ ১৪টি ঝড় এবং ৬টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে তিনটি বড় ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে ক্যাটাগরি ৩ বা তারও বেশি শক্তি অর্জন করতে পারে। সাধারণত একটি মৌসুমে গড়ে ১৪টি ঝড়, ৭টি ঘূর্ণিঝড় এবং ৩টি বড় ঘূর্ণিঝড় দেখা যায়।




