ভিয়েতনামে বসছে রসাটমের থ্রিডি প্রিন্টিং কারখানা, কী আছে এই প্রযুক্তিতে

সংগৃহীত ছবি
কোনো ছাঁচ কিংবা কাটাছেঁড়া ছাড়াই মুহূর্তেই তৈরি হয়ে যাবে জটিল ধাতব যন্ত্রাংশ। ভিয়েতনামে এমন থ্রিডি প্রিন্টিং কারখানা হতে যাচ্ছে রাশিয়ার হাত ধরে।
রুশ পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রসাটমের জ্বালানি বিভাগ এবং ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান পেট্রোভিয়েতনামের মধ্যে সই হয়েছে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি। এর আওতায় ভিয়েতনামে গড়ে তোলা হবে একটি অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং সেন্টার।
জানা গেছে, সাধারণ প্রিন্টার যেমন কাগজে কালি ছিটিয়ে লেখা ফুটিয়ে তোলে, এ প্রযুক্তিও অনেকটা সেভাবেই কাজ করে, তবে কালির বদলে থাকে গুঁড়ো ধাতু। শক্তিশালী রশ্মি দিয়ে সেই গুঁড়ো গলিয়ে দেওয়া হয়, এরপর তার ওপর আরেক পরত ছড়িয়ে আবার গলানো হয়। এভাবে স্তরের পর স্তর জমতে জমতে তৈরি হয় পুরো বস্তুটি, ঠিক নকশার আকারেই। এতে এমন সব জটিল আকৃতির যন্ত্রাংশ বানানো সম্ভব হয়, যা কারখানায় কাটা বা ছাঁচে ঢেলে বানানো কঠিন— ভেতরে ফাঁপা নালা, বাঁকা কোণ কিংবা একাধিক আলাদা অংশ জোড়া লাগিয়ে একটাই বস্তু তৈরি করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা, আলাদা ছাঁচ বা টুল বানাতে হয় না বলে নতুন যন্ত্রাংশ তৈরিতে সময় লাগে অনেক কম। কোনো যন্ত্র বিকল হলে বা পুরনো যন্ত্রাংশ আর বাজারে না পাওয়া গেলে, শুধু নকশা থাকলেই দ্রুত তার কপি বানানো যায়। যতটুকু জায়গায় ধাতু দরকার ঠিক ততটুকুই জমানো হয় বলে কাঁচামালের অপচয়ও কম হয়, যা খরচ ও পরিবেশ দুদিক থেকেই লাভজনক। এমনকি ভেঙে যাওয়া বা ক্ষয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশের ওপর নতুন করে ধাতু জমিয়ে সেটিকে মেরামত করে আবার ব্যবহারযোগ্য করাও সম্ভব, ফলে পুরো যন্ত্রাংশ নতুন করে না বানিয়েই কাজ চালানো যায়।
রাষ্ট্রীয় সফরে রাশিয়ায় থাকা ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লাম এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ চুক্তি সই হয়। অনুষ্ঠানে রসাটমের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমবিষয়ক ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল নিকোলে স্পাস্কি এবং পেট্রোভিয়েতনামের চেয়ারম্যান লে নগোক সন উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তিতে একটি সম্পূর্ণ কার্যকরী থ্রিডি প্রিন্টিং সেন্টার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির পরিধি এবং সরবরাহের সময়সূচির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিলেক্টিভ লেজার মেল্টিং এবং ডাইরেক্ট লেজার ডিপোজিশন পদ্ধতি ব্যবহার করে ধাতব উপাদান তৈরির জন্য রসাটম-নির্মিত থ্রিডি প্রিন্টার, সেইসাথে হিট ট্রিটমেন্ট, টার্নিং, ল্যাবরেটরি অ্যানালাইসিস এবং অন্যান্য প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় রুশ সরঞ্জাম।
পেট্রোভিয়েতনামের ফান তু জিয়াং-এর মতে, এ সেন্টারটির মাধ্যমে ড্রিলিং ও পাম্পিং সরঞ্জামের জন্য জটিল উপাদানগুলোর দ্রুত উৎপাদন সহজ হবে। দ্রুত প্রোটোটাইপিংয়ের মাধ্যমে ডাউনটাইম কমিয়ে আনা এবং উন্নত অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরঞ্জাম ও বড় আকারের যন্ত্রাংশ পুনরুদ্ধার এবং মেরামত করা সম্ভব হবে।
চুক্তিতে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান বিনিময়ের সহায়তায় ভিয়েতনামে মেটাল পাউডার উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উভয়পক্ষ যৌথভাবে কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড, কোয়ালিফিকেশন পদ্ধতি এবং পণ্যের সার্টিফিকেশন তৈরি করবে।
রসাটম ফুয়েল ডিভিশনের অ্যাডিটিভ টেকনোলজিস বিজনেস ইউনিটের ডিরেক্টর ইলিয়া কাভেলাশভিলি জানিয়েছেন, ‘ভবিষ্যতে ভিয়েতনামে থ্রিডি প্রিন্টার উৎপাদন স্থানীয়করণ নিয়ে আলোচনা করতে আমরা প্রস্তুত’। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রসাটম ২০২৫ সালে বেলারুশে একই ধরনের একটি কাজ সম্পন্ন করেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এ ধরনের স্থাপনা তুলনামূলক বেশ ব্যয়বহুল। শিল্প দাম শুরু হয় প্রায় এক লাখ ডলার থেকে, আর উন্নত মডেলের দাম দশ লাখ ডলারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। শুধু যন্ত্র কেনাই শেষ কথা নয়— দরকার হয় বিশেষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শীতলীকরণ সুবিধা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দামি গুঁড়ো ধাতু। এ কারণেই ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিজস্ব ছাপাখানা রাখা এখনো সহজ নয়, বরং তারা বাইরের কোনো কেন্দ্র থেকে সেবা নেয়— যেমনটা এখন গড়ে উঠছে ভিয়েতনামে।
বিশ্ব জুড়ে ধাতব ছাপাখানার বাজারও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৩ সালে এ বাজারের আকার ছিল প্রায় ১৪০ কোটি ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২২০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



