খার্তুমে ফিরছে ছন্দ

যুদ্ধের কারণে মধ্য খার্তুমের অনেক ভবন ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
রাত অনেক সময় আড়াল করে রাখে ত্রুটিগুলোকে। তেমনই সুদানের রাজধানী খার্তুমে যুদ্ধের ক্ষত স্পষ্ট হয়ে ওঠে দিনের আলোতেই। এই শহরের বহু এলাকা ও বাড়িঘর পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। তবুও ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে ছন্দ ফিরিয়ে আনার কিছু চিহ্ন। কোথাও রাস্তা থেকে সরানো হচ্ছে ধ্বংসাবশেষ। আবার কোথাও কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে যান চলাচলও।
তবে এই স্বাভাবিকতার আভাসের মধ্যেও বাস্তবতা ভিন্ন। তিন বছরের বেশি সময় আগে পালিয়ে যাওয়া শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষজন এখন ফিরছেন সতর্কতার সঙ্গে। কারণ জীবন হয়ে আসছে স্বাভাবিক। সরকারি এমন দাবির সঙ্গে বাস্তবতার রয়েছে বড় ফারাক।
খার্তুম শহরের বিভিন্ন অংশের পরিস্থিতি একরকম নয়। বিশেষ করে পূর্ব খার্তুমের ধনী এলাকাগুলো এখনও প্রায় জনশূন্য। গার্ডেন সিটি থেকে শুরু করে মানশিয়া, রিয়াদ, তাইফ, মামুরা, আরকাওয়িত ও মুজাহিদিনসহ অভিজাত এলাকাগুলোতে বিরাজ করছে কবরের নীরবতা।
ধ্বংসস্তূপে ঢাকা শহরের কেন্দ্র
খার্তুমের কেন্দ্রীয় এলাকা, বিশেষ করে আরব মার্কেট ও সিটি সেন্টার এখন প্রায় নিশ্চুপ। একসময় এখানে ছিল মন্ত্রণালয়, ব্যাংক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং স্বর্ণের মূল বাজার। এখন সেখানে জীবনের চিহ্ন খুবই কম।
তবে ফ্রিডম স্ট্রিটে প্রাণ ফিরেছে কিছুটা। বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের জন্য পরিচিত এই সড়কে খুলতে শুরু করেছে দোকানপাট। ক্রেতারাও ফিরছেন ধীরে ধীরে।
খার্তুমের দোকানগুলোতে এখন বেশিরভাগ পণ্য আসে মিসর থেকে স্থল এবং সৌদি আরব থেকে সমুদ্রপথে। তবে কিছু স্থানীয় শিল্প—বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্য, মিনারেল ওয়াটার ও প্রক্রিয়াজাত মাংস উৎপাদন শুরু হয়েছে আবার
খার্তুমের আল-আমারাত, আল-সাহাফা এবং ইয়াথরিব এলাকায় এখনও খালি পড়ে আছে বেশিরভাগ বাড়িঘর। রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় এসব এলাকা ডুবে যায় অন্ধকারে। তবে দিনের বেলায় সিক্সটি স্ট্রিটে চোখে পড়ে তীব্র যানজট। শহরের উত্তর ও দক্ষিণকে সংযুক্ত করা এই বড় সড়কের পাশে ব্যাংক, ফার্মেসি, দোকান, রেস্তোরাঁ ও জ্বালানি স্টেশন চালু হয়েছে আবার। এমনকি খুলেছে সিরীয় খাবারের রেস্তোরাঁও। কিন্তু পাশের আবাসিক এলাকাগুলো এখনও নীরব।
এখনও ফিরে আসার বিষয়ে অনেক পরিবার রয়েছে ধন্দে। আবার অপেক্ষা করছেন কেউ কেউ। যতক্ষণ না সেবাব্যবস্থা উন্নত হয় এবং আরও স্বাভাবিক হয় জীবন।
অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি চাপে নেই অনেক বাড়ির মালিক। কেউ কেউ বিদেশে জীবন গড়ে তুলেছেন নতুনভাবে। যারা ফিরেছেন, তারা জানিয়েছেন, বিদেশে থাকা অনেক প্রতিবেশী চাকরি বা ব্যবসা পেয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল জীবন কাটাচ্ছেন। ফলে অনেকে আশঙ্কা করছেন, দেশে ফিরে হয়তো একই রকম নিরাপত্তা বা আয়ের সুযোগ পাবেন না তারা।
ফিরে আসার সিদ্ধান্তে আয়, সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বড় ভূমিকা রাখছে নিরাপত্তার স্থায়িত্বও।
কারারি এলাকায় বেড়েছে ভিড়
উত্তর ওমদুরমানের কারারি এলাকায় পুনরায় বেড়েছে মানুষের আনাগোনা। বেড়েছে অর্থনৈতিক কার্যক্রমও। যুদ্ধ চলাকালে সেখানে সক্রিয় ছিল না র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)। ফলে খার্তুমের অনেক ব্যবসা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থানান্তরিত হয়েছে সেখানে। এতে যুদ্ধের আগের তুলনায় এলাকাটি এখন ভালো অবস্থায় রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে।
ওমদুরমান, উম্ম বদ্দা, ইস্ট নাইল ও খার্তুম নর্থের কিছু এলাকায়ও ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। তবে শহরের কেন্দ্র এখনও ধ্বংসস্তূপে ভরা।
সমাজবিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, যুদ্ধের মানসিক আঘাতও মানুষের ফিরে আসার পথে বড় বাধা। অনেকে স্বজন হারিয়েছেন, বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে, লুটপাটের শিকার হয়েছেন অথবা দীর্ঘদিন আটকে ছিলেন সংঘাতপূর্ণ এলাকায়। এসব অভিজ্ঞতা স্থায়ী ভয় তৈরি করেছে মানুষের মনে।
কমেছে বাড়ির দাম
যুদ্ধকালীন অনিশ্চয়তার কারণে বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছেন অনেকেই। খার্তুমের এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, বর্তমানে অনেকেই বাড়ি বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন। ফলে বিক্রির জন্য পড়ে আছে বহু বাড়ি। পূর্বাঞ্চলের এলাকাগুলোতে আগ্রহ বেশি ক্রেতাদের।
তার মতে, যুদ্ধের কারণে বাড়ির দাম কমে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা এখন কম দামে কিনছেন বাড়ি। আশা করছেন এক বছরের মধ্যে আবার দাম ফিরবে আগের অবস্থায়।
নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা বেশি পছন্দ করছেন তৈরি হওয়া বাড়ি। বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার কারণে যেসব বাড়িতে ব্যক্তিগত জেনারেটর আছে, সেগুলোর ভাড়াও বেশি।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার লড়াই
খার্তুমের মানুষের জন্য বাজার করা এখন কঠিন এক লড়াই। চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে পণ্যের দাম।
বাজারে মানুষ দোকান থেকে দোকানে ঘুরে খুঁজছেন কম দামের জিনিস। অনেকেই কিনতে পারছেন না প্রয়োজনের সবকিছু। আবার আগে নিয়মিত কেনা পণ্য বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ।
গ্রেটার খার্তুমের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে বেড়েছে যাতায়াত খরচ। বেশিরভাগ বাসই পুরোনো এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত। পুরো ভাড়া দিতে পারছেন না অনেক যাত্রী
রুটির দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় পাঁচ গুণ বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো। প্রতিদিনই নতুন দাম—এই কথাটি এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
বাধ্য হয়ে খাবার খাওয়ার পরিমাণ কমাচ্ছে হাজারো পরিবার। ধার করছে অথবা নির্ভর করছে বিদেশে থাকা স্বজনদের পাঠানো টাকার ওপর।
বিদেশি পণ্যে সয়লাব বাজার
খার্তুমের দোকানগুলোতে এখন বেশিরভাগ পণ্য আসে মিসর থেকে স্থল এবং সৌদি আরব থেকে সমুদ্রপথে। তবে কিছু স্থানীয় শিল্প—বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রক্রিয়াজাত মাংস উৎপাদন শুরু হয়েছে আবার।
ওষুধের বাজারেও একই অবস্থা। সিক্সটি স্ট্রিটের একটি ফার্মেসিতে অ্যাসপিরিন চাইলে বিক্রেতা জানান, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে কোরিয়ান, সাইপ্রাস, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি ওষুধ। পাশাপাশি সুদানের একটি নামকরা ওষুধ কারখানাও আবার ওষুধ সরবরাহ শুরু করেছে বাজারে।
পরিবহন খরচ বেড়েছে
গ্রেটার খার্তুমের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে বেড়েছে যাতায়াত খরচ। বেশিরভাগ বাসই পুরোনো এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত। পুরো ভাড়া দিতে পারছেন না অনেক যাত্রী। আংশিক ভাড়া দিচ্ছেন কেউ কেউ।
বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন খুব সাধারণ হয়ে উঠেছে। এমনকি এখন ডিজিটাল পেমেন্ট নিচ্ছেন রাস্তার পাশে গাড়ি ধোয়ার কর্মী বা চা বিক্রেতারাও।
সব প্রতিকূলতার মধ্যেও হাল ছাড়ছেন না খার্তুমের মানুষ। কঠিন জীবন, দুর্বল সেবাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে, পুরোনো কাজ শুরু করতে কিংবা নতুন উদ্যোগ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।







