অদৃশ্য দোকানের দৃশ্যমান যুদ্ধ

বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ই-কমার্স। লাখো তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করে দেশের ডিজিটাল অর্থনীিত আরও শক্তিশালী করা সম্ভব এ নতুন খাতের মাধ্যমে। কিন্তু সেজন্য চাই যথাযথ আইনি কাঠামো, নজরদারি এবং গ্রাহকসেবার মান বাড়ানো
একটা সময় ঈদের শপিং মানেই ছিল নিউ মার্কেটের ভিড়, গাউছিয়ার দরদাম কিংবা বসুন্ধরার চকচকে শোরুম। এখন দৃশ্যটা বদলেছে। আজকাল মানুষ অফিসের ডেস্কে বসে, বাসের সিটে হেলান দিয়ে কিংবা রাত ২টায় ঘুমানোর আগে মোবাইল স্ক্রল করেই কেনাকাটা সেরে ফেলছে। কয়েকটা ছবি, কিছু রিভিউ আর একটা ‘অর্ডার নাউ’ বাটন— এতেই চলছে হাজার কোটি টাকার বাজার।
বাংলাদেশের ই-কমার্স এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। বরং বলা যায়, দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দ্রুত বদলে যাওয়া খাতগুলোর একটি। গত কয়েক বছরে অনলাইন কেনাকাটা মানুষের অভ্যাসই বদলে দিয়েছে। আগে মানুষ দোকানে গিয়ে পণ্য দেখত, এখন পণ্যই মানুষের দরজায় চলে আসে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যে মানুষ একটা জামা কিনতে পাঁচটা দোকান ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যেতেন, তিনিই এখন মোবাইলের স্ক্রিনে কয়েকটা ছবি দেখে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ব্যাপারটা শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, এটি আস্থারও পরিবর্তন।
এ পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের বিস্তার। দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও এখন মানুষ ফেসবুক লাইভ দেখে শাড়ি কিনছে, টিকটক ভিডিও দেখে গ্যাজেট অর্ডার করছে কিংবা ইউটিউব রিভিউ দেখে মোটরসাইকেলের পার্টস পর্যন্ত কিনে ফেলছে। ই-কমার্স শহরের সীমা পেরিয়ে গ্রামেও পৌঁছে গেছে।
বাংলাদেশে এখন ই-কমার্সের বাজার ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ অনলাইনে অর্ডার করছেন। শুধু ওয়েবসাইট নয়, ফেসবুকভিত্তিক এফ-কমার্স এখন পুরো খাতের বড় চালিকাশক্তি। হাজার হাজার ছোট উদ্যোক্তা নিজের ঘরকেই বানিয়ে ফেলেছেন অনলাইন শোরুম।
বিশেষ করে তরুণদের কাছে ই-কমার্স এখন শুধু কেনাকাটার মাধ্যম নয়, আয়েরও বড় সুযোগ। আগে ব্যবসা করতে লাগত দোকান, বড় পুঁজি আর লোকবল। এখন একটা স্মার্টফোন, ভালো প্রোডাক্ট আর কিছু ডিজিটাল মার্কেটিং জানলেই ব্যবসা শুরু করা যায়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, চাকরিপ্রার্থী কিংবা গৃহিণী নিজেদের ছোট উদ্যোগ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন।
অনেকেই এখনো অর্ডার করার আগে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেন, ‘ভাই, পেজটা ট্রাস্টেড তো?’ এ প্রশ্নটাই আসলে পুরো খাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। অনলাইনে এখন শুধু পণ্য বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় বিশ্বাসও
বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী তরুণ। তারা প্রযুক্তি-সচেতন, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় এবং অনলাইন মাধ্যমকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে। এ ছাড়া দেশের ভৌগোলিক বাস্তবতাও ই-কমার্সের পক্ষে কাজ করে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে বড় শপিং মল বা ব্র্যান্ডের দোকান নেই, সেখানে অনলাইনই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
করোনাকাল এ খাতকে যেন হঠাৎ করেই কয়েক বছর এগিয়ে দিয়েছে। তখন মানুষ বাধ্য হয়ে অনলাইনে অভ্যস্ত হয়েছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও সেই অভ্যাস আর বদলায়নি। কারণ মানুষ বুঝে গেছে, সময় বাঁচানোও এক ধরনের প্রয়োজনীয়তা। সব মিলিয়ে এটি কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। অনেকেই নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করছেন, দেশীয় পণ্যকে তুলে ধরছেন। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করছেন অনেকে। করোনার সময় ফেসবুকভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ, কমিউনিটি অনলাইনে উদ্যোক্তা তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। কওমি উদ্যোক্তা নামে একটি গ্রুপ এক বছরে ৩০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করে, যাদের অধিকাংশই কওমি মাদ্রাসার তরুণ। যারা ছিল স্রোতের উল্টোপীঠে, ব্যবসা বা উদ্যোক্তা মানসের ঠিক বিপরীতে। নিজের বলার মতো একটা গল্প, চাকরি খুঁজব না দেব, ইয়ং এন্টারপ্রেনার সাকসেস, ওমেন অ্যান্ড ই-কমার্সসহ অনেক গ্রুপ উদ্যোক্তা তৈরিতে এখনো ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
তবে এ উত্থানের গল্পের ভেতরেই আছে অস্বস্তিকর কিছু বাস্তবতা। ই-কমার্সের সবচেয়ে বড় সংকট এখনো আস্থা। কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম আর লোভ পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধাক্কা দিয়েছে। টাকা নিয়ে পণ্য না দেওয়া, নিম্নমানের পণ্য পাঠানো, মাসের পর মাস ডেলিভারি ঝুলিয়ে রাখা— এসব ঘটনা এখনো মানুষের মনে ভয় তৈরি করে।
অনেকেই এখনো অর্ডার করার আগে বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেন, ‘ভাই, পেজটা ট্রাস্টেড তো?’ এ প্রশ্নটাই আসলে পুরো খাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। ক্রেতারা এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তারা রিভিউ দেখে, ভিডিও দেখে, পেজ যাচাই করে তারপর অর্ডার করেন। ফলে যারা সত্যিকারের উদ্যোক্তা, তারা টিকে যাচ্ছেন নিজেদের সততা আর সার্ভিসের মাধ্যমে। অনলাইনে এখন শুধু পণ্য বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় বিশ্বাসও।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে লজিস্টিক খাতে। কয়েক বছর আগেও ঢাকার বাইরে ডেলিভারি ছিল ভোগান্তির নাম। এখন কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও দ্রুত সেবা দিচ্ছে। অনেক জায়গায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে অনলাইন ব্যবসা এখন আর রাজধানীকেন্দ্রিক নেই।
এ খাতের আরেকটি শক্তি হলো দেশীয় পণ্যের প্রচার। দেশের অনেক ছোট উদ্যোক্তা নিজেদের তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, খাবার কিংবা কসমেটিকস অনলাইনের মাধ্যমে সারা দেশে পৌঁছে দিচ্ছেন। কেউ কেউ আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করছেন, অর্থাৎ ই-কমার্স শুধু বাজার তৈরি করছে না, ব্র্যান্ডও তৈরি করছে।
তবে সম্ভাবনার এই খাতকে দীর্ঘ মেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে কিছু মৌলিক জায়গায় কাজ করতে হবে।
প্রথমত, প্রতারণা ঠেকাতে শক্তিশালী নজরদারি দরকার। শুধু আইন করলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ জরুরি। এখনো অনেকেই জানেন না, কাস্টমার সার্ভিস কীভাবে দিতে হয়, কীভাবে প্রোডাক্ট প্যাকেজিং করলে রিটার্ন কমে কিংবা কীভাবে ডিজিটাল মার্কেটিং করলে গ্রাহকের আস্থা বাড়ে। ফলে ব্যবসা শুরু করলেও অনেকে টিকতে পারেন না।
তৃতীয়ত, ডেলিভারি খরচ কমানো জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, ৩০০ টাকার পণ্যের সঙ্গে ১২০ টাকা ডেলিভারি চার্জ যোগ হয়ে যাচ্ছে। এতে ক্রেতা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ডাক বিভাগকে আধুনিকভাবে ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এ সমস্যার বড় সমাধান হতে পারে।
সবশেষে একটা বিষয় পরিষ্কার— ই-কমার্স এখন আর ‘অপশনাল’ কিছু নয়। এটা বাংলাদেশের নতুন অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই খাতকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, ছোট উদ্যোক্তারা বড় হবে আর দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
কারণ, ভবিষ্যতের বাজার কাচের শোরুমে নয়, মানুষের হাতের মুঠোয় থাকবে। আর সেই অদৃশ্য দোকানগুলোর লড়াইটাই একদিন বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
লেখক: উদ্যোক্তা ও সংগঠক





