ট্রাম্পের ‘খোলা’ হরমুজে হাতে গোনা জাহাজ
- ইরানের পাল্টা শর্তে আটকে সমঝোতা

ফাইল ছবি
এক পক্ষ বলছে, আলোচনার টেবিলই এখন খালি। অন্য পক্ষ বলছে, কথা বলার দরজা বন্ধ নয় কিন্তু মাথা নত করে নয়। আর এই দুই অবস্থানের মাঝখানে আটকে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি-রুট হরমুজ প্রণালি। ইরানের সঙ্গে এখন কোনো আলোচনা চলছে না, নতুন কোনো বৈঠকও নির্ধারিত নেই, তা মঙ্গলবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তার দাবি, হরমুজ প্রণালি খোলা এবং সচল। তেহরান অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জুনের অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত না মানা পর্যন্ত ওই জলপথ স্বাভাবিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলবে না।
সোমবারই শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে জুনে হওয়া সমঝোতার ৬০ দিনের সময়সীমা। কিন্তু প্রায় ছয় মাসের সংঘাত থামানোর মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয়নি। বরং সময়সীমা পেরোনোর পর কূটনৈতিক অচলাবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় তেহরান এখন সামরিকভাবে ‘সম্পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ অবস্থানের দিকে যাচ্ছে। তবে মঙ্গলবার নতুন করে দুই পক্ষের হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কথোপকথন চলছে না, এমন কিছু নির্ধারিতও নেই। একই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ-অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি ‘খোলা ও সচল’। সেখানে থাকা সব জলমাইন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে বলেও দাবি তার।
কিন্তু ট্রাম্পের এই বক্তব্য তার নিজের প্রশাসনের সাম্প্রতিক সময়ের মন্তব্যের সঙ্গেও পুরোপুরি মিলছে না। মাত্র এক দিন আগে সোমবার তার জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে এবং তা সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও সক্রিয়। মঙ্গলবার ট্রাম্পের বক্তব্য সেই আশাবাদের ওপর কার্যত ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছে।
হরমুজ নিয়ে দুই বিপরীত দাবি
এই অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যেত। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে সীমিত করে। ওয়াশিংটন আবার ইরানি বন্দর ও জাহাজের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে।
ট্রাম্প প্রণালিটি সচল বলে দাবি করলেও বাস্তব জাহাজ চলাচলের তথ্য অন্য ছবি দেখাচ্ছে। প্রাথমিক নৌপরিবহন তথ্যে দেখা গেছে, সোমবার হরমুজ দিয়ে পার হওয়া জাহাজের সংখ্যা দুই অঙ্কেও পৌঁছায়নি। অর্থাৎ যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচলের তুলনায় প্রণালিটি এখনো কার্যত মারাত্মকভাবে অচল।
ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত হরমুজ বন্ধই থাকবে। তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড় করা এবং সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান ও হুমকি বন্ধ করা।
গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ বড় বিরোধগুলো নিষ্পত্তির জন্য ৬০ দিন সময় রাখা হয়েছিল। সেখানে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান ‘অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে’ বন্ধ করার কথাও ছিল। কিন্তু হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে সেই সমঝোতা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। সোমবার ৬০ দিনের সময় শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প জানিয়েছেন, তা আর বাড়ানোর পরিকল্পনা তার নেই।
সমুদ্রে নতুন হামলা, আমিরাতের সঙ্গে উত্তেজনাও
ট্রাম্পের ‘হরমুজ নিরাপদ’ দাবির দিনেই অবশ্য সমুদ্রপথে নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ নৌনিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজ অজ্ঞাত একটি প্রক্ষেপণের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে ক্ষতি হয়েছে এবং একজন নাবিক হতাহত হয়েছেন। ওমানের কোস্ট গার্ড বাকি নাবিকদের সহায়তা করছে। এ ঘটনা নিয়ে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
একই দিনে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ইরান থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে তারা। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র দুটির লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল; তবে দুটিই সাগরে পড়ে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এরপর আঞ্চলিক উত্তেজনার কথা উল্লেখ করে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম, বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই মার্চে দুই দেশের সরাসরি নৌবাণিজ্য বন্ধ হয়েছিল। পরে জুনের শেষ দিকে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন আবার শুরু হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সেই সীমিত স্বাভাবিকতাও ফের অনিশ্চিত হয়ে গেল।
‘আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ নয়’
ট্রাম্প আলোচনা নেই বললেও তেহরান এখনো কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবার মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপে ইরান এখনো প্রস্তুত। তবে আলোচনা আর আত্মসমর্পণকে তেহরান এক করে দেখে না। তার বক্তব্য, সামরিক চাপ কিংবা নিষেধাজ্ঞা ইরানের অবস্থান ভাঙতে পারবে না; ইরান যুদ্ধ চায় না, কিন্তু নিজের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মিত্রদের রক্ষা করবে।
ওমানও হরমুজ নিয়ে একটি পৃথক সমঝোতা তৈরির চেষ্টা করছে। তেহরান ও মাস্কাট একটি নতুন বা সাময়িক জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা করছে। ইরান আগেই জানিয়েছে, সেই ব্যবস্থা চূড়ান্ত হলেও তার অর্থ পুরো হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়া নয়; যুক্তরাষ্ট্রকে আগে অন্য শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।
এই উদ্যোগ নিয়েও ওয়াশিংটন ও মাস্কাটের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। ওমানের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে ইরানের প্রতি অতিরিক্ত ছাড় হিসেবে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন। সোমবার ট্রাম্প এমনকি হরমুজ-সমঝোতায় ওমান যুক্তরাষ্ট্রের পথে বাধা হলে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকিও দেন।
যুদ্ধের ধাক্কা তেলের বাজারেও
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত এখন প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। এই সময়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননে। পাল্টা অভিযানে ইরান, ওমান, জর্ডান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিভিন্ন অবকাঠামোয় হামলা চালিয়েছে।
সবচেয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক প্রভাব পড়েছে জ্বালানির বাজারে। যুদ্ধের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একসময় ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠে যায়, যা যুদ্ধের আগের দামের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। মঙ্গলবার তা কিছুটা নেমে ৯১ ডলারের সামান্য ওপরে স্থির হলেও দ্রুত সমঝোতার আশা কমে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ আবার বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানির দামে নয়, মূল্যস্ফীতি, শেয়ারবাজার ও বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচেও পড়ছে।
ওয়াশিংটনও জানিয়ে দিয়েছে, কূটনীতিতে অগ্রগতি না হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলার জন্য প্রেসিডেন্টের হাতে এখনো অনেক উপায় রয়েছে। তেহরানের নেতৃত্বের জন্য সেটিও বড় উদ্বেগ৷ দীর্ঘ যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ দেশে নতুন করে অসন্তোষ উসকে দিতে পারে।
মাত্র দুই মাস আগে ১৭ জুন যে সমঝোতাকে যুদ্ধ থামানোর সম্ভাব্য সেতু বলে মনে হয়েছিল, ১৮ আগস্ট এসে তার দুই প্রান্ত যেন আবার দূরে সরে যাচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনাই নেই; তেহরান বলেছে, শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ খুলবে না। মাঝখানে বিশ্ব অর্থনীতি তাকিয়ে আছে সেই সরু জলপথটির দিকে।
হরমুজের নীল জলে তাই এখন শুধু তেলবাহী জাহাজের অপেক্ষা নয়, অপেক্ষা একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও। কিন্তু ওয়াশিংটন ও তেহরানের সর্বশেষ ভাষা বলছে, শান্তির পথে জাহাজ ছাড়ার আগে দু’পক্ষের নোঙর এখনো অনেক গভীরে গাঁথা।








