ব্রিটেনের রাজনীতিতে কী কাজ করবে ম্যানচেস্টার মডেল

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি হিসেবে শপথ নিচ্ছেন বার্নহ্যাম- রয়টার্স
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর আলোচনায় অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। এক বিশেষ নির্বাচনে সদ্য পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) হিসেবে জয়ী হয়েছেন বার্নহ্যাম। লেবার পার্টির এই জনপ্রিয় নেতা স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে এখন সবচেয়ে এগিয়ে। তবে দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেদিকেই মোড় নিক না কেন, নজর এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ম্যানচেস্টারের দিকে। প্রায় এক দশক ধরে শহরটির মেয়র ছিলেন বার্নহ্যাম।
বিশ্বজুড়ে ফুটবল ক্লাব এবং চমৎকার মিউজিক সিনের জন্য পরিচিত গ্রেটার ম্যানচেস্টার বর্তমানে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল। এই শহরে নিয়মিত বাড়ছে বিনিয়োগ। বিশেষ করে পেশাদার সেবা এবং প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতে। দর্শনার্থীরাও এখানে এসে নামী-দামী রেস্তোরাঁ, প্রাণবন্ত শিল্পকলা এবং চারপাশের বিশাল সব নির্মাণকাজের এক দারুণ কর্মচাঞ্চল্য টের পান।
এই সাফল্যের পেছনে যে মডেলটি কাজ করেছে, তা প্রথম আলোচনায় আসে ২০০৯ সালে। তৎকালীন ‘ম্যানচেস্টার ইন্ডিপেনডেন্ট ইকোনমিক রিভিউ’ প্যানেলের একজন সদস্য এবং প্রধান লেখক ছিলাম আমি। প্যানেলটি যুক্তরাজ্যের ট্রেজারি এবং তৎকালীন শ্যাডো চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার জর্জ অসবোর্নের কাছে সাতটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন পেশ করে। সেই প্রতিবেদনে মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এড গ্লেজার ২০০৩ সালে যেমনটা উল্লেখ করেছিলেন, একটি শহরের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নির্ভর করে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। আর এই সক্ষমতার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী মানবসম্পদ ভিত্তি। প্রত্যেকেরই ক্রমবর্ধমান একটি শহরের সুবিধা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাই আমাদের প্রধান নীতিগত সুপারিশই ছিল এই মানবসম্পদ ভিত্তি গড়ে তোলা।
আমাদের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা। যার উদ্দেশ্যও ছিল মানুষের জন্য সুযোগের পরিধি বাড়ানো। একটি নির্ভরযোগ্য এবং সহজলভ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা ‘থিক লেবার মার্কেট’ তৈরি করতে সাহায্য করে। এই মার্কেটে কর্মীরা আরও বেশি সম্ভাব্য নিয়োগকর্তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। দেশটিতে ক্ষমতা সবসময় অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। তৎকালীন ম্যানচেস্টার সিটি অঞ্চলের জন্য যৌথ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছিল। সে সময় আমাদের সুপারিশের মধ্যে ছিল ওই কর্তৃপক্ষের হাতে কিছু খরচ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এর পক্ষে জোরাল যুক্তিও ছিল।
এর এক দশক পর আমি ‘গ্রেটার ম্যানচেস্টার ইন্ডিপেনডেন্ট প্রসপারিটি রিভিউয়ের’ সভাপতিত্ব করি। যার কাজ ছিল হালনাগাদ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রস্তুত করা। বার্নহ্যামের মেয়র হওয়ার তখন দুই বছর পেরিয়েছে। সেই রিভিউয়ে আবারও দক্ষতা, শ্রমবাজারের রূপান্তর এবং অবকাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়। তবে এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করা হয় উদ্ভাবন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ নজর।
২০২৯ সালেও যদি এমন আরেকটি রিভিউ করা হয় তাতে আমি সানন্দে অংশ নেব। তবে নির্দিষ্ট সময় পর পর এই ধরনের মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়াই ম্যানচেস্টারের সফলতার দুটি প্রধান দিক ফুটিয়ে তোলে। প্রথমত, অর্থনীতির শক্তি ও দুর্বলতাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ। দ্বিতীয়ত, সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য।
শিল্পায়ন-পরবর্তী মন্দাক্রান্ত একটি অঞ্চল আবার জাগিয়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদী বিষয়। ২০০৯ সালে ম্যানচেস্টারের অর্থনীতি নিয়ে যে পর্যালোচনা করা হয়েছিল, তার আগেই একদল নগর নেতা বছরের পর বছর ধরে নীরবে কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে চিফ এক্সিকিউটিভ হাওয়ার্ড বার্নস্টাইন এবং নির্বাচিত কাউন্সিল লিডার রিচার্ড লিস ছিলেন অন্যতম। আর ২০০৯ সাল থেকে বার্নহ্যামসহ শহরের নেতারা এমন নীতিমালার ওপর ছিলেন অবিচল। জাতীয় পর্যায়ে যেখানে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন বা অস্থিরতা দেখা যায়, তার তুলনায় ম্যানচেস্টারের এই নীতিগত স্থায়িত্ব সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে।
অবশ্য গ্রেটার ম্যানচেস্টারকে পুনরুজ্জীবিত করার এই কৌশলের পেছনে কিছু ভিন্নমতও রয়েছে। কৌশলটি একটি অর্থনৈতিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে। রাজনৈতিক নেতারা শহরের যেকোনো আঞ্চলিক প্রশাসনিক এলাকার বৈষম্য নিরসনহ যাই করতে চান না কেন, সবার আগে প্রয়োজন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। কিন্তু শহরের নেতাদের নিয়ে সমালোচনাও ছিল। শহরের কেন্দ্রে থাকা আকাশচুম্বী ভবনের সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বৈষম্য তুলনা করে তারা আপত্তিও জানিয়েছিল।
তা সত্ত্বেও, প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা চালানোর মতো পর্যাপ্ত জনসমর্থন ছিল। আর এর ফল আজ দৃশ্যমান। গ্রেটার ম্যানচেস্টারে রয়েছে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় লাইট-রেল ও ট্রাম নেটওয়ার্ক। যা পুরো দেশের মাত্র আটটি নেটওয়ার্কের একটি। ১৯৯২ সালে উদ্বোধনের পর থেকে ধাপে ধাপে এই নেটওয়ার্ক বড় হয়েছে। এ ছাড়া লন্ডনের বাইরে এটিই প্রথম অঞ্চল যা স্থানীয় সব বাস সার্ভিস নিয়ন্ত্রণে এনেছে। প্রায় ৪০ বছরের মধ্যে এমন ঘটনা প্রথম। ২০২১ সালে ‘বি নেটওয়ার্ক’ নামে এটি চালু করেন বার্নহ্যাম।
এই নেটওয়ার্ক নিয়ে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখানোর কারণে কখনো কখনো উপহাসের পাত্র হয়েছেন বার্নহ্যাম। কিন্তু ম্যানচেস্টারের ভবিষ্যতের জন্য সেবাটির গুরুত্ব অনেক। যুক্তরাজ্যের মোট গণপরিবহনের পাঁচ ভাগের তিন ভাগই স্থানীয় বাস সার্ভিস। কোনো শহরের যানজটের স্থায়ী সমাধান চাইলে এই ধরনের বাস নেটওয়ার্ক বাড়ানোর বিকল্প নেই।
বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের মান উন্নয়নের পাশাপাশি ম্যানচেস্টারের নেতারা শহরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং উদ্ভাবন ব্যবস্থা কেন্দ্রিক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন। এটি রাতারাতি হয়নি। বরং কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে। কিছুদিন আগেও এর ফল কিছুটা হতাশাজনক মনে হয়েছিল। কিন্তু প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক চক্রটি সক্রিয় হওয়ার পর অগ্রগতি কেবল বাড়েনি বরং নিজে নিজেই শক্তিশালী হতে শুরু করেছে।
যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কি জাতীয় পর্যায়ে এই ‘ম্যানচেস্টার মডেলের’ হুবহু পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন? পুরোপুরি হয়তো পারবেন না। কারণ জাতীয় নেতাদের চেয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক সমস্যা ও সমাধান বের করার পাশাপাশি জনমত গঠনে বেশি সক্ষম। তাছাড়া একজন প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিমাণ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তার তুলনায় নগর সরকারের চ্যালেঞ্জ অনেকটাই কম।
তবে ম্যানচেস্টার মডেলের মূল শিক্ষা কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চাকরি খোঁজা, কর্মক্ষেত্রে যাওয়া এবং ব্যবসা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এটি কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব, যখন কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ মেয়াদে তাদের কৌশল বা পরিকল্পনায় অবিচল থাকবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাসের একটি চরিত্রের বিখ্যাত উক্তি ধার করে বলা যায়— দেউলিয়া হওয়ার প্রক্রিয়াটি প্রথমে ধীরে ধীরে ঘটে। তারপর হঠাৎ করে। সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা সত্যি।
লেখক: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসির অধ্যাপক
ভাষান্তর: সাইখ আল তমাল





