কমেছে ব্রিটিশ সহায়তা, বাংলাদেশে দুই বছর আগেই বন্ধ হচ্ছে জলবায়ু প্রকল্প

ব্রিটিশ অর্থায়নে সুন্দরবন এলাকায় চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হতে যাচ্ছে। ছবি : রয়টার্স
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা হাজারো মানুষের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত। ব্রিটিশ অর্থায়নে সুন্দরবন এলাকায় চলমান একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হতে যাচ্ছে। ফলে সৌরবিদ্যুৎ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা ও জীবিকা সহায়তার মতো কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হতে পারেন হাজারো মানুষ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁটের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে চলমান প্রকল্পটির অর্থায়ন কমানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর দেশটির বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ মোট জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে পরিচালিত মানবিক ও জলবায়ুবিষয়ক প্রকল্পে।
ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রকল্পটির একটি অংশ পরিচালনা করছে। প্রকল্পটির আওতায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, মাছ চাষে উন্নত প্রযুক্তি, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল। কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনকে জানানো হয়, জুনের মধ্যেই প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করতে হবে। পরে সংস্থাটির অনুরোধ ও আলোচনার পর সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটির জন্য ২২ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর তুলনায় অনেক কম অর্থ পাওয়া গেছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৫৭ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল। অর্থায়ন কমে যাওয়ায় এখন প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তামান্না রহমান বলেছেন, হঠাৎ অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গত আড়াই বছরে গড়ে ওঠা আস্থার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কর্মসূচিতেও বড় ধরনের কাটছাঁট হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সহায়তার পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে নেমে আসার কথা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন এলাকার মানুষ এমনিতেই নানা সংকটে রয়েছেন। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ার কারণে কৃষি ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবন এলাকায় বছরে প্রায় তিন সেন্টিমিটার হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রভাব এখনো বহন করছেন ওই অঞ্চলের বহু মানুষ। ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধ, রাস্তা ও কৃষিজমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেক এলাকায় কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ায় পরিবারগুলো মাছ ধরা ও সীমিত কয়েকটি জীবিকার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের সহায়তায় ওই এলাকার কিছু পরিবার সৌরবিদ্যুৎ ও সৌরশক্তিচালিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আয় বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।
কালাবগী গ্রামের বাসিন্দা বীণা মণ্ডল জানান, ঘূর্ণিঝড় আইলার আগে তাদের এলাকায় প্রশস্ত রাস্তা, কৃষিজমি ও ফলের গাছ ছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের পর বাঁধ ও রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় কৃষিকাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে তাঁর পরিবার মূলত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন থেকে পাওয়া একটি ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা তাকে রাতেও কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে তাদের আয়ও কিছুটা বেড়েছে।
আরেক বাসিন্দা বাসন্তী মণ্ডল পেয়েছেন সৌরশক্তিচালিত ধান ভাঙার যন্ত্র। আগে তাকে কাজের সন্ধানে প্রতিদিন এক খামার থেকে অন্য খামারে যেতে হতো। নতুন যন্ত্রটি পাওয়ার পর তিনি বাড়িতে থেকেই আয় করার সুযোগ পেয়েছেন এবং সন্তানদের জন্যও বেশি সময় দিতে পারছেন।
প্রকল্পের আওতায় ১৪০ জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হওয়ার আগেই তাঁদের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কর্মকর্তাদের মতে, এতে অনেক উদ্যোক্তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন।
তামান্না রহমান বলছিলেন, একটি প্রকল্প ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত চলবে—এমন পরিকল্পনা থাকার পর মাত্র দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে তা গুটিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত একটি প্রকল্প শেষ করার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্থান পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু এবার সেই সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান সারাহ চ্যাম্পিয়ন এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, খুব অল্প সময়ের নোটিশে এ ধরনের একটি প্রকল্প দুই বছর আগে বন্ধ করা হলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিম্ন আয়ের দেশগুলোর পাশে থাকার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
সারাহর মতে, এতে ব্রিটিশ করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে যুক্তরাজ্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে নতুন দাতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, সুন্দরবনের মতো প্রত্যন্ত ও দরিদ্র এলাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও সহজ নয়। এসব এলাকার বহু মানুষের নগদ আয় অত্যন্ত সীমিত, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল এবং জলবায়ু দুর্যোগের কারণে অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তরের একজন মুখপাত্র বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি জরুরি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি। যুক্তরাজ্য উচ্চমাত্রার সরাসরি উন্নয়ন অনুদান থেকে ধীরে ধীরে সরে এলেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের লক্ষ্য ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
দপ্তরটি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার, বিভিন্ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নতুন অর্থায়নের উৎস তৈরির মাধ্যমে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।






