ইরান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি থেকে লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে চীন

ইরানের বান্দর আব্বাসের উপকূলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির কাছে মে মাসের শুরুতে নোঙর করা অবস্থায় থাকা তেলের ট্যাংকার। ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, প্রভাব ফেলেছে বৈশ্বিক রাজনীতিতেও। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। তবে যুদ্ধের মাঝেও নিজেদের শান্তির পক্ষে থাকা শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে চীন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলা শুরু হয় ইরানে। সে সময় উদ্বিগ্ন ছিলেন চীনের নেতারা। ইরানের সরকারও ভেনেজুয়েলার মতো বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ছিল তাদের।
কিন্তু প্রায় চার মাস পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কয়েক সপ্তাহের শান্তি আলোচনার পর একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে এখনো টিকে আছে তেহরানের শাসনব্যবস্থা। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এদিকে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব কিছুটা বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে একের পর এক বিদেশি নেতাদের সফর আয়োজন করেছে বেইজিং। অন্যদিকে, শান্তির পক্ষের শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে নিজেদের। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় প্রশংসা করেছেন চীন ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের।
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটও অনেক দেশের তুলনায় ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে চীন।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বলেছেন, ‘বেইজিং শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সক্রিয় ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।’
তবে এই চুক্তিতে চীনের সরাসরি কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেনি তিনি। একই সঙ্গে নিজেদের প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। যার মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দেওয়া চার দফা শান্তি প্রস্তাব।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি চীনকে ধন্যবাদ জানান এবং প্রেসিডেন্ট শি পুরোপুরি নিরপেক্ষ থেকে সহায়তা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, চীন নৌবাহিনী ব্যবহার করে ইরানের ওপর চাপের বিরুদ্ধে যায়নি এবং সহায়তা করেছে সমাধানের পথে।
যুদ্ধ চলাকালে সতর্ক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেছে চীন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানায় এবং নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অব্যাহত রাখে ইরানি তেল কেনা। একই সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখে দুই পক্ষের সঙ্গেই।
সংঘাত চলাকালে বেইজিং সফর করেছেন বহু দেশের নেতা। এর মধ্যে ছিলেন ট্রাম্প, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা।
আলোচনার শুরুতেই চীনের সমর্থন চেয়েছিল তেহরান। চীনকে শান্তিচুক্তির গ্যারান্টর হিসেবে চেয়েছিল। কিন্তু এই ধরনের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং।
চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে হরমুজ প্রণালির নৌচলাচল সঠিকভাবে পরিচালনার আহ্বান জানান।
ইরান যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘সুয়েজ মুহূর্ত; হিসেবে বর্ণনা করছেন চীনের কিছু বিশ্লেষক। এটিকে ব্রিটেনের বৈশ্বিক প্রভাব হ্রাসের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং মিত্রদের সমন্বয়ের দুর্বলতাও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে কেউ কেউ মনে করছেন, এতে চীনের অবস্থান ও কৌশলগত ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে।
তবে চীনা কর্মকর্তারা বলছেন, নিজেদের শক্তি বাড়লেও এখনো বিশ্ব নেতৃত্বের শীর্ষ শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে না বেইজিং। তারা বরং বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক সংকট সমাধানে বাস্তব ও কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা কতটা রাখতে পারে, সেটিই তাদের প্রভাবের আসল পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
সূত্র: সিএনএন





