পিরামিডের গায়েই লুকিয়ে ছিল রাস্তা?
- সাড়ে চার হাজার বছরের রহস্যে নতুন উত্তর

বাইরে বিশাল ঢালু পথ নয়, পিরামিডের চার ধার ঘেঁষে সাময়িক সর্পিল রাস্তা বানিয়েই কি উঠেছিল ২৩ লক্ষ পাথর? কম্পিউটার মডেলে ২০-২৭ বছরের নির্মাণকালও মিলে যাচ্ছে খুফুর শাসনকালের সঙ্গে
প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পাথরের সংখ্যা আনুমানিক ২৩ লক্ষ। কোনো কোনো পাথরের ওজন কয়েক টন, আবার রাজকক্ষের গ্রানাইটের বিশাল খণ্ডগুলোর ওজন কয়েক দশক টন পর্যন্ত। আধুনিক ক্রেন নেই, শক্তিশালী যন্ত্র নেই, এমনকি ভারী মাল পরিবহনে চাকার ব্যবহারও ছিল না। তা হলে এত অল্প সময়ে ১৪৬ মিটারেরও বেশি উঁচু গিজার মহাপিরামিড তৈরি হলো কীভাবে?
প্রশ্নটির নিশ্চিত উত্তর এখনও প্রত্নতত্ত্বের হাতে নেই। তবে নতুন এক গবেষণা সেই কয়েক হাজার বছরের ধাঁধায় বেশ চমকপ্রদ একটি সম্ভাবনা হাজির করেছে। গবেষকের প্রস্তাব, দূর থেকে বিশাল মাটির র্যাম্প বানিয়ে নয়, পিরামিডের নিজের গায়ের ধার ঘেঁষে একাধিক ঢালু পথ তৈরি করে সেই পথেই পাথর উপরে তোলা হয়েছিল। আর নির্মাণ যত উপরে উঠেছে, পথও ঘুরতে ঘুরতে উঠেছে। কাজ শেষ হলে ফাঁকা পথগুলো আবার পাথর দিয়ে ভরে দেওয়া হয়েছে। তাই বাইরে থেকে তার আর কোনো চিহ্ন চোখে পড়ে না।
স্পেনের ভ্যালেন্সিয়াভিত্তিক স্বাধীন গবেষক ভিসেন্তে লুইস রোসেল রইগ এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছেন ‘ইন্টিগ্রেটেড এজ-র্যাম্প’ বা আইইআর মডেল। তার গবেষণা গত ৭ মার্চ এনপিজে হেরিটেজ সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক মডেল, নির্মাণের সময়সূচির সিমুলেশন এবং পাথরের উপর চাপের প্রকৌশল বিশ্লেষণ, এই তিনটি একসঙ্গে ব্যবহার করে তিনি পরীক্ষা করেছেন, প্রাচীন মিসরীয়দের হাতে থাকা প্রযুক্তি দিয়েই এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারত কি না।
মডেল অনুযায়ী, পিরামিডের বাইরের প্রান্তে কিছু পাথর ইচ্ছাকৃতভাবে না বসিয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৮ মিটার চওড়া ও ৪ দশমিক ২৬ মিটার উঁচু একটি খোলা পথ রাখা হতো। পথটির ঢাল প্রায় সাত ডিগ্রি। পিরামিডের কোণে এসে সেটি ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে পরের দিক দিয়ে উপরে উঠত। অর্থাৎ পিরামিড যত উঁচু হতো, তার চার ধার ঘিরে পথটিও সর্পিল আকারে উপরে উঠতে থাকত। পরে উপর থেকে নিচের দিকে সেই ফাঁকা অংশগুলো পাথর দিয়ে ভরে দেওয়া হলে বাইরে কোনো স্থায়ী র্যাম্প অবশিষ্ট থাকার কথা নয়।
আর এখানেই নতুন তত্ত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। পিরামিড নির্মাণে বিশাল বাইরের র্যাম্প ব্যবহারের পুরনো তত্ত্বের বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন দীর্ঘদিনের—এত বড় র্যাম্প তৈরি করা হলে তার চিহ্ন কোথায়? রোসেল রইগের মডেলে সেই সমস্যাই নেই। রাস্তা পিরামিডের নির্মাণের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে, আবার কাজ শেষে পিরামিডের মধ্যেই মিশে যাচ্ছে। গবেষণার হিসাবে, ৩০ থেকে ৪০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত একটি সোজা বাইরের র্যাম্প তুলতেই প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার ভরাট উপকরণ লাগতে পারত।
গবেষকের মডেল শুধু একটি রাস্তার কথা বলছে না। নির্মাণের একেবারে নিচের দিকে পিরামিডের বিস্তার অনেক বেশি হওয়ায় সেখানে একই সঙ্গে ১৬টি অস্থায়ী পথ ব্যবহারের সম্ভাবনা মডেলে পরীক্ষা করা হয়েছে। কিছুটা উপরে উঠে তা আটটিতে এবং পরে চারটি প্রধান সর্পিল পথে নামিয়ে আনা হয়–পিরামিডের চার দিকে একটি করে। এতে একদল শ্রমিক পাথর তুলছেন, অন্য দল একই সময়ে ভিন্ন দিক দিয়ে কাজ করছেন; ফলে একটি মাত্র র্যাম্পে পাথরের দীর্ঘ সারি জমে যাওয়ার সমস্যা কমে যায়।
রোসেল রইগের মতে, আসল রহস্য হয়তো বিপুলসংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে পাথর টানানোয় ছিল না; বরং একই সময়ে বহু জায়গায় পরিকল্পিতভাবে কাজ চালানোর দক্ষতায়। তার মডেলে প্রায় ২ দশমিক ২৭ টন ওজনের সাধারণ একটি পাথর সাত ডিগ্রি ঢালে তুলতে ২৩ থেকে ২৫ জনের মতো শ্রমিকের দলই যথেষ্ট হতে পারে। গবেষণায় সামগ্রিক শ্রমশক্তির হিসাবও দেখায়, অবাস্তব সংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে দড়ি ধরানোর প্রয়োজন পড়ে না।
মহাপিরামিডের আয়তনই এই রহস্যকে এত কঠিন করেছে। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৫৬০ সালে ফারাও খুফুর জন্য তৈরি স্থাপনাটির মূল উচ্চতা ছিল প্রায় ১৪৬ দশমিক ৬ মিটার, আর প্রতিটি পাশ প্রায় ২৩০ মিটার। আনুমানিক ২৩ লক্ষ পাথর দিয়ে তৈরি এই কাঠামো খুফুর প্রায় ২৭ বছরের শাসনকালের মধ্যে শেষ করতে হলে পুরো প্রকল্পে গড়ে কয়েক মিনিট অন্তর একটি করে পাথর স্থাপনের মতো গতি প্রয়োজন ছিল।
নতুন মডেলের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, আলাদা আলাদা র্যাম্পে প্রতি চার থেকে ছয় মিনিট অন্তর পাথরের একটি চালান উপরে পাঠানো সম্ভব হলে মূল নির্মাণস্থলে কাজ শেষ হতে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ থেকে ২০ দশমিক ৬ বছর লাগতে পারে। পাথর কাটা, নীলনদ দিয়ে পরিবহন, মৌসুমি বিরতি এবং অন্যান্য প্রস্তুতির সময় যোগ করলে পুরো প্রকল্প দাঁড়ায় আনুমানিক ২০ থেকে ২৭ বছর, যা খুফুর শাসনকালের সীমার মধ্যেই।
এই হিসাবটিই গবেষণাটিকে আলোচনায় এনেছে। কারণ নতুন তত্ত্ব শুধু ‘এমন হতে পারে’ বলেই থেমে যায়নি; কম্পিউটার সিমুলেশনে পরীক্ষা করে দেখানোর চেষ্টা করেছে পাথরের প্রবাহ, শ্রমিকের প্রয়োজন, র্যাম্পের ঢাল, নির্মাণের সময় এবং পিরামিডের কাঠামোগত স্থিতি–সব একসঙ্গে ধরলেও পদ্ধতিটি অন্তত প্রকৌশলগতভাবে সম্ভব।
স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন ওঠে, পিরামিডের চার পাশে নির্মাণের সময় এমন পথ খোলা রাখলে বিশাল কাঠামোটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত না?
গবেষণায় ‘ফাইনাইট এলিমেন্ট অ্যানালিসিস’ ব্যবহার করে সেই চাপও পরীক্ষা করা হয়েছে। মডেলে দেখা গেছে, সাময়িক র্যাম্পের কারণে পাথরের উপর যে চাপ তৈরি হয়, তা প্রাচীন মিসরীয় চুনাপাথরের সম্ভাব্য সহনক্ষমতার অনেক নিচে। অর্থাৎ মডেলের শর্ত অনুযায়ী, এভাবে পথ রেখেও পিরামিড ধাপে ধাপে গড়া কাঠামোগতভাবে সম্ভব ছিল। তবে গবেষক নিজেই স্বীকার করেছেন, এই বিশ্লেষণ আদর্শায়িত পাথরের কাঠামোর উপর করা; বাস্তব নির্মাণের সব ফাটল, গতিশীল চাপ বা পাথরের ভিন্নতা এতে ধরা হয়নি।
নতুন তত্ত্বের সঙ্গে আরও একটি রহস্যের যোগ রয়েছে। মহাজাগতিক রশ্মি থেকে তৈরি মিউয়ন কণা ব্যবহার করে স্ক্যানপিরামিডস প্রকল্প আগেই খুফুর পিরামিডের ভিতরে কয়েকটি অজানা ফাঁকা জায়গা শনাক্ত করেছে। ২০১৭ সালে গ্র্যান্ড গ্যালারির উপরে অন্তত ৩০ মিটার দীর্ঘ একটি বিশাল ‘বিগ ভয়েড’ আবিষ্কৃত হয়। পরে উত্তর দিকেও একটি গোপন করিডরের অস্তিত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
রোসেল রইগের কম্পিউটার মডেলে সাত থেকে সাড়ে সাত ডিগ্রি ঢালের সর্পিল পথের সম্ভাব্য অবস্থান এই কয়েকটি অস্বাভাবিক ফাঁক বা ঘনত্বের পরিবর্তনের কাছাকাছি পড়ে। সেটি তাঁর তত্ত্বের পক্ষে আকর্ষণীয় ইঙ্গিত বটে, কিন্তু প্রমাণ নয়। গবেষণাপত্রেই স্পষ্ট বলা হয়েছে, বর্তমান মিউয়ন স্ক্যান দিয়ে ওই জায়গাগুলো ভরাট করা পুরনো র্যাম্প, অন্য কোনো নির্মাণগত ফাঁক নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু–তা নির্ধারণ করা যায় না।
তবে কি রহস্যের সমাধান হয়ে গেল? না, এখনই তা বলা যাবে না। গবেষণাটি নিজেই অনেক বেশি সতর্ক। এটি একটি পরীক্ষাযোগ্য নির্মাণ-মডেল, সরাসরি প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার নয়। পিরামিডের চার পাশে সত্যিই এমন সর্পিল পথ ছিল, এমন কোনো অক্ষত র্যাম্প এখনও পাওয়া যায়নি। গবেষক বরং ভবিষ্যৎ পরীক্ষার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট চিহ্নের পূর্বাভাস দিয়েছেন, পিরামিডের ধারে পুরনো ভরাট অংশের ঘনত্বের পার্থক্য, কোণের পাথরে ভারী চলাচলের ক্ষয় এবং নির্দিষ্ট উচ্চতায় অস্বাভাবিক গঠন। এগুলো ভূকম্পীয় পরীক্ষা, রাডার বা মিউয়ন স্ক্যানে মিললে তত্ত্বটি আরও শক্তিশালী হবে; না মিললে সেটি দুর্বল হবে।
আর এই কারণেই প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে মহাপিরামিড নির্মাণ নিয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য নেই। ২০২৫ সালেই একই বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে আরেক গবেষক একেবারে ভিন্ন একটি মডেল প্রস্তাব করেছিলেন যেখানে বলা হয়েছিল, পিরামিডের গ্র্যান্ড গ্যালারি ও অন্য ঢালু পথগুলোকে পাল্টা-ওজন এবং কপিকলের মতো ব্যবস্থায় ব্যবহার করে পাথর তোলা হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ নতুন আইইআর মডেল অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও এটিই শেষ কথা নয়।
মহাপিরামিড ঘিরে আরেকটি জনপ্রিয় ধারণাও আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব অনেক আগেই বদলে দিয়েছে, লক্ষ লক্ষ দাসকে চাবুক মেরে পিরামিড তৈরি করানো হয়েছিল, এমন ছবির পক্ষে প্রমাণ নেই। গিজায় শ্রমিকদের বসতি, খাবার, চিকিৎসা এবং সংগঠিত কর্মীদলের প্রমাণ মিলেছে। আবার ওয়াদি আল-জার্ফের প্রাচীন প্যাপিরাসে মেরের নামে এক কর্মকর্তার নথিতে তুরা থেকে উৎকৃষ্ট চুনাপাথর নৌকায় গিজায় নিয়ে যাওয়ার বর্ণনাও রয়েছে। অর্থাৎ পিরামিড ছিল শুধু পাথর টানার শক্তির প্রদর্শনী নয়; পরিবহন, খাদ্য, দক্ষ শ্রম, জরিপ এবং প্রশাসনের এক বিশাল রাষ্ট্রীয় প্রকল্প।
নতুন গবেষণা তাই হয়তো মহাপিরামিডের শেষ রহস্যটি ভেঙে দেয়নি। কিন্তু পুরনো প্রশ্নটির দিকে তাকানোর ভঙ্গি বদলে দিয়েছে।
সাড়ে চার হাজার বছর আগে মিসরীয়রা কীভাবে ২৩ লক্ষ পাথর আকাশের দিকে তুলেছিলেন, এর উত্তর হয়তো কোনো অলৌকিক প্রযুক্তিতে নয়, বরং অত্যন্ত সাধারণ কয়েকটি জিনিসের অসাধারণ ব্যবহারে লুকিয়ে ছিল: ঢালু পথ, দড়ি, কাঠের স্লেজ, একসঙ্গে বহু দলের কাজ এবং এমন এক নির্মাণপদ্ধতি যেখানে কাজ শেষ হলে নির্মাণের রাস্তাটিই পিরামিডের শরীরের মধ্যে হারিয়ে যায়।




