‘খুন, ইজ্জত আর টিকে থাকার লড়াই’— লেবার এমপি নাজ শাহর অবিশ্বাস্য জীবন

বোন ফোজের সঙ্গে নাজ শাহ
নাজ শাহ, ব্রিটেনের লেবার পার্টির এমপি। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত নাজের মা খুনের দায়ে কারাগারে ছিলেন ১৪ বছর। মা কেন খুনী হলেন, কেন তাদের গ্রেফতার করা হয়, নাজ সেটা জানতে পেরেছেন বহু বছর পর। ছোট দুই ভাই-বোনকে ১৮ বছর বয়সী নাজ একা হাতে মানুষ করেছেন। তারও আগে দুইবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন— ক্রমশ শক্তিশালী আর রাজনৈতিক ভাবে দক্ষ হয়ে উঠেছেন। নাজের নিজ হাতে লেখা বায়োগ্রাফিও প্রকাশিত হয়েছে।
নাজ শাহের জীবন এবং বায়োগ্রাফি নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক সাইমন হ্যাটেনস্টোন কথা বলেছেন তার সঙ্গে। অভিজ্ঞতার বর্ণনা লিখেছেন বিস্তারিতভাবে :
নাজ শাহের বয়স তখন ১৮ বছর। তাকে এবং তার মাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারা গ্রেফতার হন সেই ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে, যাকে ‘চাচা’ বলে ডাকতেন নাজ শাহ। এই ঘটনা এবং ঘটনার জেরে পরবর্তীতে তার জীবনে যা ঘটেছিল, সবকিছুই নতুন মোড় নেয়। এছাড়াও লেবার পার্টি, নিজের ভুল এবং নিজের যন্ত্রণাদায়ক জীবনের গল্প নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
খুনের দায়ে গ্রেফতার হওয়ার স্মৃতি ‘বেশ রোমাঞ্চকর’ বলে দাবি করেন নাজ শাহ। ব্র্যাডফোর্ড ওয়েস্টের এই এমপি বলেন, ‘সত্যি বলছি, আমি আদতে বেশ মজা পাচ্ছিলাম। আমার এই অভিশপ্ত জীবনে আগে এরচেয়ে উত্তেজনাকর কিছুই ঘটেনি। আগে আমি কোনোদিন পুলিশ স্টেশনে পা রাখিনি। তখন আমি ছিলাম একদমই অভিজ্ঞতাহীন মানুষ। আমি ছিলাম প্রচণ্ড আড়ালে আগলে রাখা এক কিশোরী যাকে হঠাৎ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল, ওরা হয়তো কোনো ভুল করছে। কেবল কিছু সময়ের অপেক্ষা। সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।’
‘পুলিশ আমার কাপড়গুলো নিয়ে নিলো এবং পরার জন্য একটি সাদা স্যুট দিলো। আমি তখন বলছিলাম, ‘দেখো, এই পোশাকে আমাকে আকর্ষণীয় লাগছে, তাই না? ভাবো তো, এই পোশাক পরা অবস্থায় আমি ডেটে বের হচ্ছি!’ আমি পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করছিলাম। সত্যি বলতে আমি তখন এত সরল ছিলাম পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারিনি।
নাজ শাহের পারিবারিক আত্মীয় ‘আজম চাচা’ ১৯৯২ সালের এপ্রিলে হঠাৎ মারা যান। ময়নাতদন্তে বেরিয়ে আসে, তাকে আর্সেনিক বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। নাজ শাহ এবং তার ইংরেজি কম জানা সাদাসিধা মা জুরা, আগের রাতে একসঙ্গে খাবার রান্না করছিলেন। আজম চাচা সে রাতে তাদের সঙ্গে খেয়েছেন। সেই সূত্র ধরে মা-মেয়েকে গ্রেপ্তার করে আলাদা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে নাজ শাহ মুক্তি পেলেও জুরা স্বীকার করেন ‘আজম চাচার খাওয়া সেই মিষ্টি খাবার তিনিই তৈরি করেছিলেন’ যাতে আর্সেনিক বিষ ছিল। মাসব্যাপী বিচার প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে জুরা আজম খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পুলিশ স্টেশনে নাজ শাহের রোমাঞ্চকর অনুভূতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মায়ের সাজা ঘোষণার পর তিনি পরপর দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। কিন্তু সত্য হলো শেষপর্যন্ত তিনি জীবনযুদ্ধে জয়ী। পরিণত লড়াকু মানুষে রূপান্তরিত হন।
১২ বছর বয়সে নাজকে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। ১৫ বছর বয়সে তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়। মায়ের জেল হওয়ার পর নিজের ছোট দুই ভাই-বোনকে বড় করার দায়িত্ব নেন নাজ। এ সত্ত্বেও তিনি নিজেকে প্রখ্যাত অধিকারকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তিনি জীবনে অনেকগুলো চাকরিতে উচ্চ পদে কাজ করেছেন এবং গত ১১ বছর ধরে পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে আছেন। নিজের জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বেশ রোমাঞ্চে ভরা একটি জীবন কাটিয়েছি।’
কথা বলার সময় আমি (সাইমন হ্যাটেনস্টোন) আবিষ্কার করলাম নাজ আসলে তার জীবনের ভয়াবহ ঘটনাগুলো সাধারণ ভাষায় বর্ণনা করার অদ্ভুত ক্ষমতা রাখেন। ছয় বছর বয়সে তার হিরোইন ব্যবসায়ী ও স্ত্রী-নির্যাতনকারী বাবা তার মাকে ছেড়ে যান। একজন অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে সংসার শুরু করেন। এই ঘটনা পরিবারের ওপর যে কলঙ্ক বয়ে এনেছিল, সেটিই আদতে তার মায়ের জীবনের দুর্দশার জন্য দায়ী।
২০১৫ সালে ব্র্যাডফোর্ড ওয়েস্ট আসনে জর্জ গ্যালোওয়ের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে নাজ তার পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে একটি ব্লগ প্রকাশ করেন। তার ভাবনা ছিল, তিনি যদি নিজের গল্প বলার দায়িত্ব নিজে না নেন, তবে অন্যরা এর অপব্যবহার করবে। সে সময় তার ব্লগে তিনি এই গল্পটি বলেছিলেন একজন অধিকারকর্মী হিসেবে। মায়ের হয়ে লড়াই করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন আমার (সাইমন হ্যাটেনস্টোন) সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় তিনি এটি বলছেন অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে। যেন বেশ কিছুটা নির্ভার হয়ে। একজন মানুষ হিসেবে তিনি সেই ভয়াবহ বিভীষিকা সহ্য করেছেন এবং আজকের মানুষটিতে পরিণত হয়েছেন।
তার স্মৃতিকথার নাম ‘অনার্ড’ (Honoured)। কারণ তিনি একজন সংসদ সদস্য হতে পেরে এবং এত প্রতিকূলতায় টিকে থাকতে পেরে সম্মানিত বোধ করেন। এই বইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামের সো কল্ড ‘ইজ্জত’ বা সম্মানের ধারণা। তবে বইটি বিপরীত দিকও ফুটিয়ে তুলেছে, যেমন ‘অসম্মান’ও।
তাদের সংস্কৃতিতে, ‘ইজ্জতহীন’ একটি পরিবারের কোনো মূল্য নেই। যেদিন বাবা ফেলে চলে গিয়েছিল, সেদিন তারা সম্মান হারিয়েছিল—আর তার মায়ের হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাই তার জীবনে বয়ে আনে ভয়াবহ পরিণতি।
সাক্ষাৎকারটি নিতে আমি (সাইমন হ্যাটেনস্টোন) গিয়েছিলাম তার ব্র্যাডফোর্ডের বাড়িতে। পাথরের তৈরি একটি চমৎকার কটেজ। ঘরের ভেতর আগুনের কুণ্ডলী জ্বলছে। তার বিড়াল ‘রুবি’ কয়েকটা কাঠি নিয়ে খেলছিল। নাজ কথা বলতে বলতে নিজের হাতে আমাদের জন্য চা বানাচ্ছেন। আমি সময়ের কিছুটা আগেই চলে এসেছি। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনি তখনও পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন না।
‘আমাকে কয়েক মিনিট সময় দিন। আপনি কি কিছু ফল খাবেন? আমি কি আপনার জন্য টেলিভিশন ছেড়ে দেব? এটাকে নিজের ঘরই মনে করুন।’
কিছুক্ষণ পর তিনি পরিপাটি হয়ে ফিরে এলেন। হাতে একটি সিগারেটের প্যাকেট। ‘আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি? বাচ্চারা যখন এখানে থাকে, তখন আমি ঘরের ভেতর ধূমপান করতে পারি না।’ আলাদা থাকলেও নাজের দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে তিনটি সন্তান। তবে তার স্বামী কাছাকাছিই থাকেন এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ ভালো।
‘নিশ্চয়ই।’
আমি তাকে তার বায়োগ্রাফির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই বইটি নিয়ে তিনি এখন কেমন বোধ করছেন।’
‘সেদিন হুট করেই সাদিক খানের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল,’ তিনি বললেন। লন্ডনের মেয়র এবং সাবেক লেবার এমপি সাদিক খান তার বন্ধু। নাজ তাকে তার বায়োপিক পড়ার জন্য প্রুফ কপি দিয়েছিলেন। ‘সাদিক বলেছিলেন, এটা পড়ার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক’। কথাটা বলে তিনি নিজের বুকের ওপর হাত রেখেছিলেন।
তার মনোবল হয়তো পেনাইনস পাহাড়ের মতোই অটল, কিন্তু তিনি এবং তার পরিবার যে নরকযন্ত্রণা সহ্য করেছেন, তা আর কেউ ভালো বুঝে উঠতে পারবে না।
৫২ বছর বয়সী নাজ শাহ ২০১৭ সালে বইটি লেখা শুরু করেন। তারপর দীর্ঘ ছয় বছরের জন্য লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন।
‘আমার নিজেকে সারিয়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। এটি লিখতে গিয়ে অনেক পুরনো ইস্যু সামনে চলে আসছিল।’ দুই বছর আগে তার পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার ধরা পড়ে। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের সব যন্ত্রণা বের করার জন্য এবং কঠিন সময়ও যে পার করা সম্ভব তা মানুষকে দেখানোর জন্যই তাকে এটি লিখতে হয়েছে।
‘এটি কোনো দুঃখগাথা বা কষ্টের স্মৃতিকথা নয়’, নাজ বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন। ‘আমি এখন আমার নিজের বাড়িতে আগুনের কুণ্ডলীর পাশে বসে আছি। এখন আগুন জ্বালিয়ে রাখা কিংবা বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার জন্য টোকেন কেনার চিন্তা না করে একটি আলো জ্বালিয়ে রাখতে পারছি। এই বিষয়গুলো আমার জীবনে ছোট করে দেখার উপায় নেই। আমি আজ যেখানে পৌঁছেছি, তাই আমার শক্তির পরিচয়।’ নাজ দেখতে ছোটখাটো এবং ছিপছিপে গড়নের হলেও তিনি আসলে শক্ত ধাতুতে গড়া।
‘আমার লড়াই শুরু হয় গর্ভে থাকার সময় থেকেই। সত্যি বলতে যেহেতু মেয়ে হিসেবে জন্মেছিলাম, তাই আমার বাবার কোলে ওঠার সৌভাগ্য ততক্ষণ হয়নি যতক্ষণ না তার একটি ছেলে সন্তান হয়েছিল।’ তার বাবা এতটাই হতাশ হন যে, জীবনের প্রথম এক বছর তিনি মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাতেন না।
নাজের জন্মের পর তার মা কিছুদিন যেতে না যেতেই আবারও সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন এবং একটি ছেলের জন্ম দেন, যে জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। নাজ শাহের মামা তখন তার বাবাকে বলেছিলেন যে, এটি সম্ভবত বিধাতার পক্ষ থেকে একটি বার্তা— যাতে তিনি মেয়েকে মূল্যবান মনে করে আগলে রাখেন।
তখন নাজ শাহের বাবা অদ্ভুতভাবে তা-ই করতে শুরু করেন। তবে কিছুদিনের জন্য। তিনি নাজকে টেলিভিশনের ওপর তুলে ধরতেন এবং বনি এম-এর ‘ব্রাউন গার্ল ইন দ্য রিং’ গানের তালে তালে তাকে বনবন করে ঘোরাতেন। নাজ তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তখন তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী এবং বেশ সচ্ছল একজন ব্যক্তি। তাদের কলোনির মধ্যে একমাত্র তাদের পরিবারেই একটি রঙিন টেলিভিশন আর ভিডিও রেকর্ডার ছিল।
পাঁচ বছর বয়সে নাজ দেখলেন বাবা তার মায়ের চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করছেন। ‘আমি কী করব বুঝতে না পেরে দৌড়ে দুই তলার সিঁড়ি বেয়ে প্রতিবেশীদের কাছে গিয়েছিলাম। তাদের দরজা ধাক্কাচ্ছিলাম যাতে তারা এসে বাবাকে থামান।’ তার মায়ের ওপর বাবার সহিংসতা কেবল একবারই ছিল না। কিন্তু তিনি নিজেকে বোঝাতেন এটি সাময়িক মনোবৈকল্য মাত্র। আসলে তার বাবা একজন ভালো মানুষ। নাজের মা স্বামীকে ঠিকই ভালোবাসতেন।
একদিন নাজের বাবা তাদের ফেলে চলে গেলেন। পরিবারটিকে চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়ল। ততদিনে নাজের এক বোন ফোজ এবং ভাই ইমি জন্মেছে। তার বাবা কোনো এক প্রতিবেশীর প্রেমে মজেছেন এমন খবর রটেছিল। খবরটা পুরোপুরি ঠিক ছিল না। আসলে যে প্রতিবেশী নারীকে সন্দেহ করা হচ্ছিল, আসলে ওই প্রতিবেশীর ১৬ বছর বয়সী মেয়েটির সঙ্গেই তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিছুদিন পর তাকেই তিনি বিয়ে করেন। আর এটাই ছিল সেই সময় যখন ‘ইজ্জত’ বিষয়টি সামাজিকভাবে নাজের সামনে এসে দাঁড়াল।নাজকে বলা হলো— ‘বাবা ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ায় তার সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে। মা জুরার বয়স তখন মোটে ২৪, তিনি খণ্ডকালীন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতেন। হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের অদম্য জেদ তাকে পেয়ে বসল। তিনি ভাবলেন, নিজের বিয়ের গয়না বিক্রি করে ১০ হাজার পাউন্ডের একটা বাড়ির জন্য ডাউনপেমেন্ট করলেই হয়তো সমাজে আবার মাথা তুলে দাঁড়ানো যাবে। কিন্তু স্থায়ী কোনো চাকরি না থাকায় জুরা তখন মর্টগেজ বা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না।ঠিক এই সংকটকালেই তাদের জীবনে ‘আজম চাচা’র প্রবেশ। তিনি না ছিলেন কোনো আত্মীয়, না প্রকৃত বন্ধু। আত্মীয়তার মুখোশ পরেই এদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘তিনি আমাদের জন্য মাঝেমধ্যে ফল নিয়ে আসতেন। তখন তাকে সাক্ষাৎ ত্রাতা মনে হত। কিন্তু আসলে তিনি এক অসহায় তরুণীর চরম দুর্দশার সুযোগ নিচ্ছিলেন।’ আজম বিবাহিত ছিলেন। তিনি জুরাকে বললেন, বাড়িটি তিনি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করবেন, জুরা কিস্তির টাকা তার হাতে দেবেন আর পুরো টাকা শোধ হয়ে গেলে তিনি বাড়িটি জুরার নামে লিখে দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল বীভৎস। যেদিন তিনি জুরাকে তার নতুন বাড়িতে প্রথম নিয়ে গেলেন, সেখানেই তিনি তাকে ধর্ষণ করলেন এবং তা চলতে থাকল।পরে যেদিন আজম চাচা হিরোইন কেনাবেচার দায়ে জেলে গেলেন, তার অবর্তমানে অন্যান্য হিরোইন ব্যবসায়ী, অপরাধী সঙ্গীরা বাড়ির সদাইপাতি নিয়ে আসত। জুরা তাদের নিয়ে ওপরতলায় যেতেন, যাতে বাচ্চারা হোমওয়ার্ক করার সময় কিছু দেখতে না পায়। যখন তিনি নিচে নেমে আসতেন, তাকে প্রচণ্ড বিধ্বস্ত দেখাত। কখনো কখনো তার শরীরে কালশিটে দাগ থাকত।১২ বছর বয়সে নাজকে পাকিস্তানে আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম ঘুরতে যাচ্ছি। কিন্তু পরবর্তী আড়াই বছরের মধ্যে আর ফেরা হয়নি আমার। এমনকি স্কুলের চৌকাঠও আর কোনোদিন মাড়ানো হয়নি। যে পর্যন্ত না আমার নিকাহ সম্পন্ন হয়েছে, সে পর্যন্ত ওরা আমাকে ফিরতে দেয়নি।’আত্মীয়রা তাকে বলেছিল, এই বিয়েতে তার মা জুরার সম্মতি আছে, যদিও তা ছিল মিথ্যা। ১৬ বছর বয়সে নাজের স্বামী তার কাছে চলে আসে। সেই কিশোর ছিল অপরিপক্ক, অত্যাচারী আর প্রচণ্ড নিয়ন্ত্রণকামী। মাত্র ছয় মাস যেতে না যেতেই তিনি সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।সেই কিশোরী বয়সে নাজ যখন নিজের জীবনের হাল ধরার চেষ্টা করছেন তখনই আজম চাচা মারা যান। নোজের চোখে আজম তখনও ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু যখন তার মা জুরার জেল হলো, চারিদিকে রটে গেল— ‘আজম চাচা’ নাজকে যৌন নির্যাতন করতেন বলেই জুরা তাকে খুন করেছেন। এই রটনা তাকে মানসিকভাবে একদম তছনছ করে দিয়েছিল। নাজ তখনো জানতেন, আজম চাচা তার মাকে কোনোদিন স্পর্শ করেননি, আর তিনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন তার মাও আজমকে খুন করেননি। একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন নাজ।দ্বিতীয় ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং স্থানীয় পত্রিকার প্রথম পাতায় ছবি ছাপা হচ্ছিল। সবকিছু এত বেশি অসহ্য হয়ে উঠে যে আমি মুক্তি চেয়েছিলাম।’ একটু থেমে তিনি বলেন, ‘এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার আত্মহত্যার চেষ্টা ছিল সম্ভবত চিরতরে বেঁচে যাওয়ার জন্যই এক আর্তচিৎকার।’জুরার বিচার যখন শুরু হয়, নাজের বয়স তখন ২০। এক মাস ধরে চলা সেই বিচারের প্রতিটি দিন তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার সময় ‘মায়ের ডান হাতটা ছিল মুখের ওপর, যেন চিৎকার চেপে ধরার চেষ্টা করছেন। অন্য হাতটা দিয়ে সামনের রেলিংটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তার চোখজোড়া আমার চোখের ওপর আটকে ছিল। ঠিক যেন দৃষ্টি দিয়ে আমাকে শক্ত করে জাপটে ধরার এক নিঃশর্ত চেষ্টা। সেই দৃশ্যটা আজও আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।’ ডুকরে উঠন নাজ।এমন অনেক স্মৃতিই আছে, যা বয়ে বেড়াতে তাকে আজও লড়াই করতে হয়। ২০ বছর বয়সে তিনি গৃহহীন হয়ে পড়েন। আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াতেন। আজমের মৃত্যুর পর ১১ বছর বয়সী ফোজকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাকে ফেরাতে ১৯৯৩ সালে মা জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় ইমিকে পাঠিয়েছিলেন নাজ। কিন্তু ফিরতি ফ্লাইটের টাকা না থাকায় তারা সেখানেই আটকে পড়েন। নাজ তখন সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। ‘একপর্যায়ে আমি একটি মাদকের আস্তানায় ছিলাম। আজও সেই ভয়াবহ, উৎকট গন্ধটা নাকে পাই।’ এরপর এলো তার প্রথম একাকী ঈদ। ‘আমার কাজিন পিনি আমাকে ফোন করেছিল এবং তখনই আমার মনে পড়ল— আমার বোন নেই, ভাই নেই। আমার মা তালাবদ্ধ ঘরে বন্দি। এসব ভেবে ভেবে আমি একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম।’















