গাজার একমাত্র খোলা দরজাতেও এখন ইসরায়েলের সেনা

রাফা ক্রসিংয়ের ছবি
দুই বছর পর বাড়ি ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলেন উম মোহাম্মদ। মিশরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় রেখে এসেছিলেন পরিবারকে। ১৮ মাস আগে ইসরায়েলি অভিযানে নিহত হয়েছেন তার ছেলে।
প্রবাসেই দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে চার এতিম নাতি-নাতনির জন্য কিনেছিলেন কিছু পোশাক ও খেলনা। সেই উপহারগুলো নাতি নাতনিদের হাতে তুলে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু গাজায় ফেরার পথে সীমান্তেই ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন।
৬৫ বছর বয়সী, ছয় সন্তানের জননী উম মোহাম্মদের অভিযোগ, কেরেম আবু সালেম সীমান্তে ইসরায়েলি সৈন্যরা তার স্যুটকেস খুলে সব জিনিস স্বচ্ছ প্লাস্টিকের পাত্রে ঢেলে পরীক্ষা করে। পরে শিশুদের জন্য কেনা কিছু পোশাক আবর্জনায় ফেলে দেওয়া হয়। চোখের পানি সামলাতে সামলাতে তিনি বলেন, 'আমার ছেলে মারা গেছে, নাতি-নাতনিরা এতিম। তাদের জন্য কষ্ট করে কাপড় কিনেছিলাম। সৈন্যরা আমার সামনেই সেগুলো ফেলে দিল।'
তবে উম মোহাম্মদের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয়। জুনের শেষ দিকে চালু হওয়া নতুন ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থার মাধ্যমে গাজায় ফেরা বহু ফিলিস্তিনি একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, নিরাপত্তা তল্লাশির নামে অপমানজনক আচরণ, ব্যক্তিগত সামগ্রী জব্দ এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
আগে মিশর থেকে গাজায় ফেরার প্রধান পথ ছিল রাফাহ সীমান্ত। কিন্তু বর্তমানে নতুন ব্যবস্থায় রাফাহ সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার পর যাত্রীদের বাসে করে কেরেম আবু সালেম ক্রসিংয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ইসরায়েলি বাহিনীর চূড়ান্ত তল্লাশি শেষে তবেই গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, যাত্রীদের স্যুটকেস বালুর ওপর ছড়িয়ে রয়েছে, বাতাসে উড়ছে কাপড়চোপড়। প্রত্যাবর্তনকারীদের দাবি, অনেককে মাত্র কয়েক মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।
মিশরে চিকিৎসা শেষে ফেরা মাহমুদ বলেন, সৈন্যরা তাদের সব ব্যাগ খালি করতে বাধ্য করে। পরে বাইরে এসে দেখেন, মালপত্র মাটিতে ছড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, 'এটি স্বাভাবিক নিরাপত্তা পরীক্ষা মনে হয়নি। মনে হয়েছে আমাদের অপমান করাই উদ্দেশ্য।' তল্লাশির পর তার কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রীও হারিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন।
আরেক প্রত্যাবর্তনকারী আহমেদ আল-নাজ্জার জানান, তার সুগন্ধি, হাতঘড়ি, মোবাইল ফোনসহ কয়েকটি জিনিস জব্দ করা হয়েছে। কেন নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, 'আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে যেন আমরা নিজেদের বাড়িতে ফেরা মানুষ নই, অপরাধী।'
২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহ সীমান্তের ফিলিস্তিনি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। চলতি বছরে সীমান্ত আংশিক খুললেও চূড়ান্ত প্রবেশের আগে ইসরায়েলি তল্লাশি বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার মানুষ গাজা ছেড়েছেন এবং প্রায় একই সংখ্যক মানুষ নতুন ব্যবস্থায় ফিরে এসেছেন। গাজার রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহেদ ফেরওয়ানার মতে, এটি শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়; ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি উপায়। তাঁর ভাষায়, একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা শেষে ফিরছেন বা একজন দাদি এতিম নাতি-নাতনির জন্য উপহার নিয়ে আসছেন- এসব মানবিক মুহূর্তও অপমানের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
যে রাফাহ একসময় ছিল বাইরের বিশ্বের সঙ্গে গাজার শেষ স্বাধীন সংযোগ, সেটিও আজ ইসরায়েলি তল্লাশি ও নিয়ন্ত্রণের ছায়ায়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। এমন বাস্তবতায় গাজার মানুষের কাছে বাড়ি ফেরা শুধু যাত্রা নয়, প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আর সেই পথের শেষ দরজাতেও যখন সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও অপমানের অভিযোগ শোনা যায়, তখন সীমান্তটি কেবল একটি চেকপয়েন্ট নয়- যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়ার আরেকটি প্রতীক হয়ে ওঠে।
উল্লেখ্য যে, গাজার মোট আয়তন ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। ভূখণ্ডটিতে ঐতিহাসিকভাবে ৭ টি স্থল সীমান্ত ক্রসিং থাকলেও যুদ্ধ ও নিরাপত্তা বিধিনিষেধের কারণে অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা সীমিত ব্যবহারে রয়েছে। বহু বছর ধরে রাফাহই ছিল গাজার একমাত্র প্রবেশদ্বার, যা সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে রাফাহ সীমান্তের ফিলিস্তিনি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। পরে সীমান্ত আংশিক খুললেও বর্তমানে মিশর থেকে আসা যাত্রীদের কেরেম আবু সালেমে ইসরায়েলি তল্লাশি পার হয়ে গাজায় ঢুকতে হয়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে গাজার বড় অংশ ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণ, বাফার জোন ও নিষিদ্ধ এলাকার আওতায় এসেছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা কোনো না কোনোভাবে প্রবেশ-নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। ফলে প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের এই ভূখণ্ডের একটি সীমিত অংশেই অধিকাংশ ফিলিস্তিনি গাদাগাদি করে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ভাষান্তর: রুবাইয়া জেসমিন




