কাতারের কান্না ভুলে কুনিয়ার রূপকথা

সংগৃহীত ছবি
চার বছর আগে নভেম্বরের এক বিকেল। ব্রাজিলের তৎকালীন কোচ তিতে কাতার বিশ্বকাপের দল ঘোষণা করছিলেন। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ফুটবলাররা টিভির সামনে বসে ছিলেন চাতক পাখির মতো। নাম ঘোষণার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে কেউ মাতলেন বাঁধভাঙা উল্লাসে, কেউবা ডুবলেন বুকভাঙা হতাশায়। দলে জায়গা না পেয়ে টিভির সামনে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন মাথেউস কুনিয়া। সেই বুকফাটা কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছুঁয়ে গিয়েছিল লাখো ফুটবলপ্রেমীকে। মরুর বুকে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দৌড় থেমেছিল শেষ আটে। তবে সময়ের চাকা ঘোরে আপন নিয়মে, তার সঙ্গে বদলেছে কুনিয়ার ক্যারিয়ারের গল্পটাও। কাতারে ব্রাত্য কুনিয়া এখন খেলছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। এ বিশ্বকাপে জড়িয়েছেন ব্রাজিলের বিখ্যাত নয় নম্বর জার্সি। হাইতির বিপক্ষে জোড়া গোলে তিনিই সেলেসাওদের নতুন নায়ক। মরক্কোর সঙ্গে ড্র করে সমর্থকদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিল কার্লো আনচেলত্তির দল। রাফিনিয়া-কাসেমিরোদের ম্লান ফুটবল দেখে অনেকে অবিশ্বাসের সঙ্গে চোখ মুছেছেন- এটাই কি সেই পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল? এই ফুটবল নিয়ে কীভাবে আসবে আরাধ্য হেক্সা? সব সংশয় আর সমালোচনার মেঘ কর্পূরের মতো উড়ে গেল শনিবার ফিলাডেলফিয়ায়। হাইতিকে ৩-০ গোলে চূর্ণ করে স্বরূপে ফিরল আনচেলত্তির দল। হলুদে ছেয়ে যাওয়া গ্যালারিতে উঠল সাম্বার ঢেউ। সেই ঢেউয়ে ভেসে চললেন কুনিয়া। প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়ে উঠলেন নিজের ট্রেডমার্ক উদযাপনে মেতে, যা দেখে বিশ্ব সার্ফিং লিগও মজা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে দিল, “কুনিয়া তো দারুণ সার্ফিং করতে পারেন!”
প্রথম আক্রমণটির শুরু কুনিয়া নিজেই করেছিলেন। ২২ মিনিটে মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে ব্রুনো গিমারেজের দিকে বাড়ান। সেখান থেকে বল পান ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ভিনির শট হাইতিয়ান গোলরক্ষক প্লাসিদে ফিরিয়ে দিলেও ডিফেন্ডার ডেলক্রোয়েক্স তা ক্লিয়ার করতে গিয়ে মেরে বসেন কুনিয়ার গায়ে। বল ডিফ্লেক্ট হয়ে জড়ায় জালে। ৩৬ মিনিটে আবারও সেই ভিনি-কুনিয়া রসায়ন। এবার ভিনির পাস ধরে বাঁ পায়ের মাপা ও বুলেটগতির শটে ব্যবধান ২-০ করেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই তারকা। কিন্তু রিচার্লিসন কিংবা গ্যাব্রিয়েল জেসুসদের মতো পরীক্ষিত ফরোয়ার্ডদের টপকে ব্রাজিলের এই ঐতিহাসিক নাম্বার নাইন জার্সিটা কীভাবে কুনিয়ার কাঁধে উঠল? রোনালদো নাজারিওদের স্মৃতিধন্য এই জার্সির পাহাড়সম চাপ কুনিয়া সামলাতে পারবেন—সেটাই বা কার্লো আনচেলত্তি কীভাবে বিশ্বাস করলেন? উত্তরটা আসলে লুকিয়ে আছে ওল্ড ট্রাফোর্ডের সবুজ গালিচায়। গত গ্রীষ্মে সাড়ে ৬২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল মূল্যে ওল্ড ট্রাফোর্ডে যোগ দেওয়ার পর রেড ডেভিলদের জার্সিতে যেভাবে কুনিয়া নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন, সেটাই আনচেলত্তিকে বাধ্য করেছে তার ওপর বাজি ধরতে। প্রিমিয়ার লিগে ৩৩ ম্যাচে ১০টি চোখধাঁধানো গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট করে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টেবিলের তৃতীয় স্থানে তোলার মূল নায়ক ছিলেন এই কুনিয়াই। অবশেষে স্বপ্ন হলো সত্যি। নিজের ২৭তম জন্মদিনে যোগ দিলেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ক্যাম্পে।
কষ্টের দিনগুলো পেরিয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত কুনিয়া হাইতি ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘কঠিন সময়গুলোই আপনাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে আসে। গত বিশ্বকাপে না থাকাটা ভীষণ কষ্টের ছিল, কিন্তু আজ আমি এখানে। নিজের স্বপ্ন সত্যি করতে পারার চেয়ে আনন্দদায়ক আর কিছুই হতে পারে না। বিশ্বকাপে ৯ নম্বর জার্সি পরা অনেক বড় সম্মানের। তবে চাপ থাকবেই। আমি এখানে কোনো চাপ নিতে আসিনি, সুযোগটি উপভোগ করতে এসেছি। কোচ আনচেলত্তি আমাকে মাঠে মুক্তভাবে খেলার স্বাধীনতা দিয়েছেন। আমরা এক ঝাঁক বন্ধু। দলে প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও আমরা একে অপরকে ভীষণ সমর্থন করি।’ চার বছর আগের ছবিটা ছিল ভীষণ ধূসর। ২০২২ সালে আতলেতিকো মাদ্রিদে ফর্মহীনতার বৃত্তে বন্দি থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল কুনিয়ার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। চার বছর আগের সেই জমানো কষ্ট আর চোখের জল ২০২৬ সালে ফিলাডেলফিয়ায় এসে রূপ নিল অনাবিল আনন্দে। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে মাঠ কাঁপানো এক দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে কার্লো আনচেলত্তির তুরুপের তাস এখন ম্যাথিউস কুনিয়া। জোড়া গোল করে নায়ক বনে যাওয়ার রাতেও কুনিয়া ছিলেন মাটির মানুষ। ম্যাচ শেষে উদযাপনের আলো যখন তার ওপর, কুনিয়ার হৃদয় তখন পড়ে ছিল গ্যালারিতে থাকা পরিবারের কাছে। আবেগাপ্লুত কুনিয়া বলছিলেন, ‘আমি এখনো ফোন ছুঁয়েও দেখিনি। গ্যালারিতে আমার পরিবারের চোখে আনন্দ অশ্রু দেখতে পাচ্ছিলাম। দূর থেকে মা আমাকে অন্তত ১০ বার ইশারায় আশীর্বাদ করেছেন। এই সুন্দর মুহূর্তটা আমি শুধু তাঁদের সাথেই ভাগ করে নিতে চাই।’
মরক্কো ম্যাচে আনচেলত্তির নাম্বার নাইন ছিলেন থিয়েগো। কিন্তু তার বাজে পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপের মাঠে নামেন কুনিয়া। প্রথম সুযোগেই করলেন বাজিমাত। ২৪ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে হেক্সা মিশনের স্বপ্ন পূরণে ব্রাজিলের সামনে এখনো পড়ে আছে চড়াই-উতরাইয়ে ভরা এক কণ্টকাকীর্ণ পথ। হাইতির বিপক্ষে জিতে তাই পরমানন্দে ভেসে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই জয় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিঃসন্দেহে নতুন করে উজ্জীবিত করবে। গতকাল কুনিয়া জ্বলে উঠেছেন, পরের ম্যাচে হয়তো পাদপ্রদীপের আলোয় আসবেন অন্য কেউ। কুনিয়াদের জয়ে পুরো বিশ্ব নেচে উঠবে সাম্বার তালে। দিনশেষে বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব তো ফুটবলই।







