জেগে উঠেছে এশিয়ার বাঘ

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গোলের পর ‘রাইফেল তাক’ করা উদযাপন ইরানের মোহেবির
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ বসবাস করে এশিয়া মহাদেশে। সেই হিসেবে ফুটবলের সবচেয়ে বেশি দর্শকও এখানে। এশিয়া মহাদেশে ফুটবলের বাজার ধরতে ইউরোপের ফুটবল আয়োজকরা কত কিছুই না করেছেন! ম্যাচের সময়সূচি এগিয়ে আনা, বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের কিছু ম্যাচ এশিয়া মহাদেশের আয়োজন করাসহ প্রাক-মৌসুম সফরে এশিয়া মহাদেশে আসাটা ইউরোপের দলগুলোর নিয়মিত দৃশ্য। তবে এই বিশ্বকাপে এশিয়ার দলগুলো স্রেফ দর্শক হয়েই থাকতে চাইছে না। ৪৮ দলের ২০২৬ বিশ্বকাপে এশিয়া মহাদেশ থেকে অংশ নিচ্ছে ৯ দল, ৮ দল সরাসরি আর ইরাক এসেছে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়াকে হারিয়ে। সোমবার পর্যন্ত এশিয়ার সাতটি দেশ খেলেছে এবারের বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ, হারেনি কোনো দলই।
শুরুর দিনই চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে দিয়েছে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ কোরিয়া। কাতার ১-১ গোলে ড্র করেছে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে। ভৌগোলিকভাবে ওশেনিয়া মহাদেশে অবস্থিত হলেও অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দল খেলে এশিয়ান কনফেডারেশনে, তাই তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ২-০ গোলের জয়টাও যোগ হয়েছে এশিয়ার খাতাতেই। দুবার পিছিয়ে পড়েও নেদারল্যান্ডসকে ২-২ গোলে রুখে দিয়েছে এশিয়ার আরেক পরাশক্তি জাপান। সৌদি আরব ১-১ গোলে ড্র করেছে উরুগুয়ের বিপক্ষে। সৌদিদের অবশ্য ফল আগের বারের চেয়ে খারাপই হয়েছে, ২০২২ বিশ্বকাপ তো তারা শুরু করেছিল আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে! নানান বিধিনিষেধ আর যুদ্ধবিগ্রহ দমিয়ে রাখতে পারেনি ইরানকে, তারাও শুরুর ম্যাচে ড্র করেছে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। এখনো মাঠে নামার অপেক্ষায় আছে ইরাক ও জর্ডান।
বিশ্বকাপের প্রথম দিকের আসরে এশিয়ার অংশগ্রহণ রীতিমতো ব্রাত্য ছিল। ১৯৩৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে প্রথম কোনো এশিয়ান দল অংশ নেয়, দলটি ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ। সে সময় ডাচ উপনিবেশ থাকা ইন্দোনেশিয়াই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রথম এশিয়ান দল, যারা হাঙ্গেরির বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেলে ৬-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। ইয়ান মাস্টেনব্রোকের কোচিংয়ে আচমাদ নাউইরের নেতৃত্বে যে দলটা খেলেছিল ফ্রান্সের রেইমস শহরের মিউনিসিপ্যালিটি ভেলোড্রোমে, তাদেরই দেখানো পথে ২০২৬ বিশ্বকাপে পৌঁছে গেছে এশিয়া মহাদেশের ৯টি দল।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১২ বছর বিরতি দিয়ে ফের বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে গড়ায় ১৯৫০ সালে, আয়োজক ব্রাজিল। সেখানেও এশিয়ার কোনো প্রতিনিধি ছিল না। খরচ এবং দুরূহ যাত্রার কারণে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, বার্মা ও ভারত আমন্ত্রণ পেলেও খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর ১৯৫৪ সালে এসে ফিফা এশিয়ান অঞ্চলের জন্য একটি বাছাই পর্বের আয়োজন করে; যেখানে অংশ নেয় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। দুই লেগে জাপানকে ৫-১ গোলে হারিয়ে ও ২-২ গোলে ড্র করে দক্ষিণ কোরিয়া প্রথমবারের মতো পা রাখে বিশ্বকাপে।
১৯৫৮’র বিশ্বকাপে ফিফা চালু করে অদ্ভুত এক নিয়ম। এশিয়া আর আফ্রিকার সম্মিলিত বাছাই পর্ব থেকে উতরে আসা একমাত্র দলকে আন্তঃমহাদেশীয় বাছাই পর্ব খেলতে হবে ইউরোপের একটি দলের সঙ্গে। এই নিয়ম মানতে রাজি না হয়ে অনেক দল বিশ্বকাপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এশিয়ার সবগুলো দলই অস্বীকৃতি জানালে ইসরায়েল খেলে ওয়েলসের সঙ্গে প্লে অফ, সেই ম্যাচে ওয়েলস ২-০ তে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে দুটি ম্যাচই জিতে বিশ্বকাপ খেলতে আসে। ১৯৫৮’র বিশ্বকাপে ছিল না আফ্রিকা ও এশিয়ার কোনো প্রতিনিধিত্ব। ১৯৬২’র চিলি বিশ্বকাপেও এ দুই মহাদেশের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না।
১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডে এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে উত্তর কোরিয়া। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে প্রথম খেলার সুযোগ পায় ইরান; স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করাই ছিল তাদের সেরা সাফল্য। পরের বিশ্বকাপেও এশিয়া থেকে একটিই দল খেলে, কুয়েত। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে প্রথম এশিয়া থেকে একাধিক দল খেলে বিশ্বকাপে, অংশ নেয় ইরাক ও দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও এএফসি থেকে দুই দলের জায়গা বরাদ্দ ছিল; ’৯০-তে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে খেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত; ৯৪-তে দক্ষিণ কোরিয়া আর সৌদি আরব। নিয়মিত অংশগ্রহণের সুবাদে দক্ষিণ কোরিয়া ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে এশিয়ান অঞ্চলে, ১৯৯৮ বিশ্বকাপে এশিয়ান দলের সংখ্যা বেড়ে হয় ৪। ২০০২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপান ছিল যৌথ আয়োজক। দুই স্বাগতিকই নিজেদের গ্রুপে হয় চ্যাম্পিয়ন; কোরিয়ানরা হারিয়েছিল পোল্যান্ড ও পর্তুগালকে আর জাপান রাশিয়াকে হারিয়ে ও বেলজিয়ামের সঙ্গে ড্র করে। দক্ষিণ কোরিয়া পরের রাউন্ডে আয়ারল্যান্ড ও কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারিয়ে পৌঁছে যায় সেমিফাইনালে। সেটিই বিশ্বকাপে কোনো এশিয়ান দলের সেরা সাফল্য এখন পর্যন্ত।




